বিথী আপার কথা মনে আছে তোর!
অই যে মামুন ভাইয়ের বোন, যে মামুন ভাই আমাদের ক্রিকেট খেলা শেখাতেন৷ তুই লাফিয়ে পড়ে তার ছুড়ে দেয়া বল দারুণভাবে তালুবন্দি করতিস দেখে তোকে বলতেন জন্টি রোডস৷ আর আমি সহজ-সোজা বলেও ব্যাট ছোঁয়াতে পারতাম না, প্রথম বলেই আউট হয়ে যেতাম৷ কি ভয়ঙ্করভাবেই না রাগ দেখাতেন আমার ওপর! শাস্তিও দিতেন৷ একবার প্রাকটিসে আসতে দেরি হলো৷ সারাটা স্কুল মাঠ আমাকে দৌড়ালেন৷ প্রায় আট ঘন্টা লাটিমের মতো ঘু্র্ণণের পর আমাকে বললেন বাড়ি চলে যেতে৷ তিনি আর ক্রিকেট শেখাবেন না আমাকে৷ ক্রিকেট নাকি সময় জ্ঞান আছে যাদের তাদের খেলা৷ তার এসব কর্মকাণ্ডে আমার ভীষণ জেদ হতো৷ একেকবার ভাবতাম— শিখবো না আমি এ ঘোড়ার ডিমের খেলা৷ কিন্তু ঠিকই বিকেল হলে ঘরে বসে থাকতে পারতাম না৷ স্কুল মাঠে ছুটে চলে আসতাম৷ মামুন ভাই প্রাকটিসের প্রথম দিন ক্রিকেটের যে মাহাত্ম্য মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন তা আমাকে ধাক্কা দিয়ে স্কুল মাঠ পর্যন্ত নিয়ে আসতো৷
এই যে মামুন ভাই, তারই ছোট বোন বিথী আপা৷
তুই তাকে দেখিসনি হয়তো; তবে আমি তার কথা বলেছি তোকে নিশ্চয়৷
তার কথা লোকের কাছে বলারই মতোন ছিলেন তিনি৷ ওই বয়সেই কেমন কলজে ছেঁড়া রূপ!
বিথী আপা আমাদের স্কুলে আমারই দু ক্লাস ওপরে পড়তেন৷
মামুন ভাইয়ের বিশেষ শাগরিদ অামি; আমার সাথে বিথী আপার তাই খাতির জমে যায়৷ মাঝে মধ্যে তাদের বাড়িতেও যেতে হতো আমাকে৷ কখনও বিথী আপা আবার কখনও মামুন ভাইয়ের আম্মা এটা ওটা করিয়ে নিতেন আমাকে দিয়ে৷
গোপনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরদিনই দুর্নিবার
বিথী আপা সেবার ক্লাস এইটে পড়ছেন৷, আর আমি ক্লাস সিক্সো৷ একদিন ছুটির পরবিথী আপা ডাকলেন আমাকে৷ বলললেন
: আমার একটা কাজ করে দিবি ভাই?
: ওমা! এভাবে বলছো কেন! তোমার কোন কাজটা আমি করে দিইনি শুনি!
: রাগ করিস না, ভাই৷ কাজটা একটু গোপন৷ কেউ জেনে গেলে অসুবিধা৷ তাই এমন করে বললাম৷
: হুম৷ পারব৷ তা ঠিক কি করতে হবে শুনি!
: আজ বিকেল বেলা তাহলে একটু আমাদের বাড়িতে আসিস!
গোপনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরদিনই দুর্নিবার৷ বিকেল না হতেই তাই মামুন ভাইদের বাড়ির দিকে ছুটে চললাম৷ যদিও সেদিনের প্রাকটিস আমাকে কোরবানী দিতে হয়েছিল, যদিও পরদিন মামুন ভাই কর্তৃক শাস্তির ভয় হৃদয়ে মুহূর্মুহূ জেগে উঠছিল!
বিথী আপা আমার হাতে নিল চৌকো একখান খাম ধরিয়ে দিলেন৷ দেখতে ভারী চমৎকার৷ স্পর্শ করতেই বোঝা যায়— অমন খাম বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না৷ কাগজ কেটে যত্ন নিয় বানানো৷ খামটির শরীর জুড়ে উন্মোচিত মায়া৷
: বাহ্, চমৎকার তো! আমায় দিলে?
: হুম, তোকেই তো দিলাম৷ তবে অন্য কাউকে পৌঁছে দেবার জন্যে৷
অত সুন্দর একটা জিনিস হাত ফসকে গেল৷ বিষণ্ন বোধ করলাম খানিকটা৷
: কাকে?
: তোদের বাদল ভাই আছেন না! তার হাতে দিবি এটা৷ খবরদার খুলবি না!
: কি আছে এতে!
: আছে!
: ও, বুঝেছি৷ চিঠি!
: তোকে অত পাকনামো করতে হবে না৷ যা বললাম করগে!
: তা ওই বাদলের মতো বাঁদর ছেলেকে তুমি চিঠি দিতে যাবে কেন!
: বললাম না, পাকনামো করিস না৷ যা বললাম পারলে করে দে৷ নইলে দে, খামটা ফেরত দে৷
: আচ্ছা বাবা, পৌঁছে দেব৷ এমনিই বললাম৷
: তার হাতেই দিবি কিন্তু৷
: তার আগে বলো আমাকে কি খাওয়াবে?
: বল কি খেতে চাস?
: আইসক্রিম৷ চকোবার!
: যা৷ খাওয়াব৷ দেখিস, কেউ জেনে না যায় আবার!
: পাগল! নিশ্চিন্ত থাকো৷ কেউ জানবে না৷
তুই তো বাদল ভাইকে চিনতিস৷ ফুটবল খেলতে গিয়ে একবার যে তোর পা মচকে দিয়েছিল! মনে পড়ে?
আমাদের স্কুলেই, বিথী আপার দু ক্লাশ ওপরে পড়তো৷ বুঝতেই পারছিস, বিথী আপার সামনে সেদিন ওকে এমনিই বাঁদর বলিনি৷ বাঁদরের মতোই দেখতে ছিল৷ কাঁধ সমান চুল রাখতো৷ আর যত্তসব বাউণ্ডুলে ছেলেদের সাথে মিশতো৷ আবডালে সিগারেট টানতো বলেও শুনেছি৷ দেখলেই গা জ্বলে যেত৷ বিথী আপার অনুরোধে এমন ফাজিল ছেলের সামনে সপ্তাহে কয়েকবার গিয়ে দাড়াতে হতো আমাকে৷ হাতে নিয়ে বিথী আপার গায়ের গন্ধ জড়ানো নীল চৌকো খাম৷
স্কুলের গেট পেরিয়ে দুই তিন গলি পার হয়ে রিক্সা নিতেই আমি বুঝে যাই বিথী আপা কোথায় যাচ্ছে
কিশোর-কিশোরী কিম্বা মানব-মানবীর সম্পর্কের রসায়ন বোঝার মতো বোধ তখনও আমার জন্মেনি৷ আমার তখন যে বয়স আমি বুঝতাম না— একটা জীবন কেন অকস্মাৎ আরেকটা জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়ে এবং সে জড়িয়ে পড়াটা এতটাই ওতোপ্রোতভাবে যে এক সময় মনে হতে থাকে— ওই মানুষটাকে ছাড়া বেচে থাকাটা অর্থহীন৷
বিথী আপার ভেতর এক পর্যায়ে গিয়ে এমন উপলব্ধ তৈরী হয়েছিল৷ সেটা ঘটনার আরও বিস্তার ঘটবার পরের কথা৷ তার আগে তোকে আমি এক ঘোর লাগা দুপুরের কথা বলে নিতে চাই৷ যে দুপুর আমার বিশ্বাসী মনকে বিষিয়ে তুলেছিল, বিথী আপাকে নিয়ে আমার পুরোনো ভাবনাগুলো চূর্ণ করে তার সম্পর্কে নতুন ভাবনার দেয়াল নির্মানে আমার বোধে তুমুল ধাক্কা দিয়েছিল৷
তখন, সেই বয়সে, কোনো কোনোদিন আশ্চর্য দুপুর আসতো আমার জীবনে৷ দুপুরগুলোর গায়ে লেগে থাকতো প্রখর সোনারঙা রোদ৷ সোনারঙা রোদের উন্মাতাল গন্ধে চোখ বুজে আসতো৷ আবেশ, মাদকতা কিম্বা প্রখর রোদের উত্তাপ চারপাশ থেকে জাপ্টে ধরতো আমাকে৷ যেনবা অক্টোপাশ৷ আর তারপরই আবশ্যিকভাবে মাথা ঝিম মেরে উঠলে ক্লাসের হাই বেঞ্চে মাথা এলিয়ে দিয়ে স্বপ্নের মধ্যে ডুব দিতাম৷
এমনই একদিন ডুবে আছি ঘোরে৷ অচেনা এক কিশোরী ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে; আমারই দিকে ৷ মুখে তার স্মীত হাসি৷ দেখে ঘুমের মধ্যেই চমকে উঠলাম৷ যেন সে দূর কোন দ্বীপ থেকে এসেছে৷ যে দ্বীপে কোন অশুভের ছায়া পড়েনি কোনোদিন৷ কাছে আসতেই, মুখের হাসি আরও বিস্তৃত করতেই এক গুচ্ছ তাজা বেলীর গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো বাতাসের গায়ে৷ সেই মোহময় সুবাস গায়ে মেখে তলিয়ে যেতে থাকলাম ঘুমের আরও অতলে৷
কারও মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভাঙলো, মিষ্টি স্বপ্নটাও৷ দেখি— বিথী আপা দাড়িয়ে মাথার কাছে৷ বেলীর গন্ধ কী তবে তার শরীর থেকে ছুটছে!
: আমার সাথে যাবি এক যায়গায়?
: উঁহু৷ খুব ঘুম পাচ্ছে৷ তুমি যাও৷
: চল না!
বিথী আপার কণ্ঠে ঝরে পড়া কাতরতা আমার ঘুম দূর করে দেয়৷ আমি উঠে দাড়িয়ে পড়ি৷ বলি,
: চলো৷
স্কুলের গেট পেরিয়ে দুই তিন গলি পার হয়ে রিক্সা নিতেই আমি বুঝে যাই বিথী আপা কোথায় যাচ্ছে৷ আগেও কয়েকবার গিয়েছি আমি তার সাথে এই ঠিকানায়৷ রিক্সা এসে দোতলা বাড়িটির সামনে নামিয়ে দিল আমাদের৷ এই বাড়িটির দোতলা বিথী আপার গন্তব্য৷ আমি সিঁড়ির গোড়ায় পেতে রাখা চেয়ারটাতে বসলাম৷ বিথী আপা অন্য বারের মতোই ‘যাব আর আসব৷ তুই একটু বস এখানে’ বলে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে যায়৷
বাড়িটি নির্জন৷ পাড়াটাও শান্ত৷ বাড়ি ওয়ালাদের বৃক্ষপ্রেম চোখে পড়বার মতো৷ রোদ্রকে পাহাড়া দিয়ে রেখেছো যেন সাড়ি সারি উঁচু সব গাছ৷ নানান রঙের টবে বাহারি পাতা ও নাম না জানা কী সব ফুলের গাছ গেটের দুপাশে লম্বা করে সাজানো৷ বাড়িতে ঢুকলে প্রথমে চোখে পড়ে টবের এই লম্বা গাছগুলি৷ এতসব গাছগাছালি বাড়িটিকে অতিরিক্ত নিরবতা এনে দিয়েছে৷ তবে মন্দ লাগে না৷ একটা মন ভালো করা গন্ধ লেগে আছে বাড়িটির বাতাসের গায়ে৷
কীসে সেদিন কাঠের চেয়ারে বসে থাকা আমার শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়ছিল তা আর এতদিন পর ঠিকঠিক তোকে বলতে পারছি না
খানিক সময় পর৷
এমনিই, কৌতূহল হলো বাড়ির ওপরটা একটু দেখে আসি৷ আর এটাই আমার ভুল ছিল, বুঝলি! এটাই ভুল ছিল৷ দোতলার করিডোরে পা রাখতেই ঈষৎ হা হয়ে থাকা দরোজায় আমার চোখ আটকে গেল৷ আজও মনে পড়়লে আফসোস হয়— কেন আমি সেদিন দোতলায় উঠতে গেলাম৷ বিশ্বাস ভেঙে গেলে যে মানুষ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে— সেদিন, সেই বয়সেই প্রথম আমার উপলব্ধ হয়৷ আমি দেখি— বাদল ভাই বিথী আপার ঠোঁটে তার ঠোট ডুবিয়ে রেখেছে৷ হ্যাঁ, বাদল ভাইই৷ তার আলুথালু ঝাকড়া চুল আমার অচেনা ছিল না৷ যদিও জানতাম না— সেটা বাদল ভাইদের বাড়ি ছিল৷ আগে এলেও কখনও জিজ্ঞেস করিনি বিথী আপাকে৷ তার ওপর আমার ওই অগাধ বিশ্বাসের কারণেই৷ ভাবতাম— বিথী আপার কোন বান্ধবীর বাসা হবে৷
বিথী আপার খোলা পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না৷ দরোজা থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে দ্রুত গিয়ে নেমে সেই চেয়ারটাতে এসে বসলাম৷ লজ্জা, ঈর্ষা নাকি ক্ষোভ— কীসে সেদিন কাঠের চেয়ারে বসে থাকা আমার শরীরে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়ছিল তা আর এতদিন পর ঠিকঠিক তোকে বলতে পারছি না৷
যে বাড়িটির স্নিগ্ধ শীতল গন্ধে মন ভালো করে দেয়া একটা ব্যাপার অনুভব করছিলাম খানিক আগেই সেই বাড়িতেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো৷ আর এক মুহূর্তও বসলাম না আমি কিম্বা বসে থাকতে পারলাম না৷ সোজা গেট থেকে বেরিয়ে হাটতে থাকলাম৷ বিথী আপার কথা একবারও মনে এলো না৷ মনে এলো না— কীভাবে কার সাথে বাড়িতে ফিরবে সে! আমি কেবল সবকিছু ভুলে হাটতে থাকলাম৷ অনেক বেলা হেটে দিঘীর পাড়ে গিয়ে নিশ্চুপ বসে রইলাম৷ সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকলাম আমি দিঘীর পাড়ে, কদম গাছটির তলায়৷

এই গল্পটা শিখরে পড়েছি মনে হয়। এবং প্রচণ্ড ভালো লাগার কথাও বলেছি একদিন মেসেঞ্জারে।