এই আবশ্যিক পরিবর্তন ও বিবর্তনের ধারা পরবর্তীদের জন্য সভ্যতার বিনির্মাণের প্রধান নিয়ামক৷ কারণ, আমরা জানি— পরিবর্তন হামেশাই ইতিবাচক ফল হাজির করে না; নেতিবাচক অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি করে আমাদের৷ আর অতীত বিবর্তনের ইতিহাস যেহেতু ভবিষ্যত সভ্যতার বিনির্মাণের মূল উপাদান সেহেতু অতীতকে জানতে হবে তার পরিবর্তনের ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতা সমেত৷ নতুবা উপকারী সমাজ বিনির্মাণের উদ্যোগ কলকে পাবে না৷
ইবনে খালদুন বলেন— এইখানে ঐতিহাসিকদের বিরাট দায় রয়ে গেছে৷ যে সকল ঐতিহাসিক এই সমস্ত দায় এড়িয়ে রাজ-রাজরাদের নিছক কিছু বংশলতিকা রচনা করার মধ্য দিয়ে ইতিহাস রচনার মতো মহান দায়িত্বে অবহেলার পরিচয় দেয় সভ্যতার বিনির্মাণে তাদের কোন অংশ থাকতে পারে না৷ তাদের সে গালগল্পে ভরা ইতিহাস গ্রন্থ ভাঁগাড়েই নিক্ষেপিত হবার যোগ্য এবং হয় ও৷
ঐতিহাসিকের দায় তবে কী?
ইবনে খালদুন বলছেন— সময় ও যুগের পরিবর্তনে জাতি ও গোত্রগুলোর মধ্যে যে অনিবার্য পরিবর্তন দেখা দেয় একজন ঐতিহাসিক সে সকল পরিবর্তনের পেছনের কারণ খুঁজে বের করবেন৷ কেবল ঘটনার পারম্পর্য বর্ণনা করে তিনি ক্ষান্ত হবেন না৷ বরং ঘটনার পেছনের ঘটনাও তিনি তুলে আনবেন ঐতিহাসিকের সূক্ষ্ম বিচারিক পদ্ধতিতে৷ রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের সংবাদ জানানোই কেবল ঐতিহাসিকের কাজ নয়; বরং সেই উত্থান ও পতনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বিশ্লেষণধর্মী আলোচনাও হাজির করবেন৷
ঐতিহাসিক যেহেতু বাস করেন বর্তমানে কাজেই অতীত ও বর্তমানের প্রাপ্ত উপকরণের সামঞ্জস্য ও অসামঞ্জস্যের তুলনামূলক বিচার তাকে করে দেখাতে হবে৷
আর এই সামঞ্জস্য প্রদানের জন্য অবশ্যই একজন ইতিহাসবিদকে রাষ্ট্রব্যবস্থার নিয়মাবলী, সৃষ্টজগতের বিচিত্র প্রকৃতি এবং প্রবৃত্তি, চরিত্র, প্রথা, মত, পথ ও অন্যান্য সকল বিষয়ের দিক থেকে স্থান-কাল-পাত্রের পার্থক্যের বিষয়টি যথার্থভাবে জেনে নিতে হবে৷ তাকে আরও জেনে নিতে হবে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও ধর্মীয় মতবাদের ভিত্তি, তাদের প্রকাশের প্রাথমিক অবস্থাসমূহ, বিকাশ ও অনুপ্রেরণার কারণগুলো এবং তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট মানবগোষ্ঠী ও তাদের পর্যাপ্ত তথ্যাদী৷
পূর্বেকার মনীষীরা এই বিবেচনায় ইতিহাস চর্চাকে মহৎ কর্ম বলে ফায়সালা দিয়েছিলেন৷ এবং তবারী, বুখারী, ইবনে ইসহাক প্রমুখ ইতিহাসবিদ তাঁদের কর্মের ভেতর দিয়ে ইতিহাস চর্চার সার্থকতা প্রমাণ করেছিলেন৷
এরপর ইবনে খালদুন এক সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন৷ যা আমাদের জন্য ভয়ের উদ্রেককারী পাশাপাশি সতর্কও করে দেয় ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপ সম্বন্ধে৷ ইবনে খালদুন বলছেন— কিন্তু অধিকাংশ ঐতিহাসিকই এ বিশেষ তত্ত্বটি সম্পর্কে অবহিত নন৷ ফলে তাঁদের উক্ত বিষয়ে (ইতিহাস চর্চা) আত্মনিয়োগ মূর্খতার পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ইতিহাসকে তারা অত্যন্ত সহজ বিষয় মনে করে তার পঠন-পাঠন, আহরণ, অনুসন্ধান ও অনুকরণে ব্যপৃত হয়েছে৷ পরিণামে ভালোর সাথে মন্দ, মজ্জার সাথে খোসা ও সত্যের সাথে মিথ্যা মিশে একাকার হয়ে গেছে৷
