শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
আহমাদ সাব্বির
  • চিন্তালাপ
  • চিত্তশুদ্ধি
  • অতীত কথন
  • ব্যক্তিপুস্তক
  • গল্পপত্র
  • স্মৃতিমেঘ
  • ভাবচিত্র
  • বই কেন্দ্রিক
  • দিন যাপন
  • কবিতা ভবন
  • আমার বই
No Result
View All Result
  • চিন্তালাপ
  • চিত্তশুদ্ধি
  • অতীত কথন
  • ব্যক্তিপুস্তক
  • গল্পপত্র
  • স্মৃতিমেঘ
  • ভাবচিত্র
  • বই কেন্দ্রিক
  • দিন যাপন
  • কবিতা ভবন
  • আমার বই
No Result
View All Result
আহমাদ সাব্বির

সুবাস জড়ানো অলিন্দে ৷ প্রথম কিস্তি

মুফতী তাকি উসমানী হাফিজাহুল্লাহর নির্বাচিত কথামালা

১৭ সেপ্টেম্বর , ২০২১
A A
সুবাস জড়ানো অলিন্দে ৷ প্রথম কিস্তি
Share on FacebookShare on Twitter

“তিনিই আল্লাহ; তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই৷”

—সুরা হাশর: ২২

১

ইসলামের মূল ভিত্তি স্থাপিত তাওহীদের কালিমার ওপর৷ তাওহীদের কালিমা অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ পাঠ করে আল্লাহ তালার একত্ববাদের স্বীকারোক্তি প্রদান করার মধ্য দিয়েই ইসলামে প্রবেশ করতে হয়৷ এই কালিমার বিস্ময়কর ফলাফল হলো—কালিমাটি পাঠ করা মাত্র মানুষের জীবনে এক অভাবিত পরিবর্তন ঘটে যায়: যে ছিল আল্লাহতে অবিশ্বাসী কালিমাটি পড়ে ওঠা মাত্রই সে হয়ে পড়ে বিশ্বাসীদের দলভুক্ত৷ যে ছিল আল্লাহ তালার ক্রোধের পাত্র সেই হয়ে ওঠে তাঁর একান্ত প্রিয় ভাজন৷ যার নসীবে লেখা ছিল জাহান্নাম তার জন্য ফায়সালা করা হয় চির সুখের জান্নাতের৷ আমার এই কথা কোন কাব্যিক অতিরঞ্জন নয়—মানুষকে জাহান্নামের তলানি থেকে উঠিয়ে মুহূর্তেই জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ আসনে সমাসীন করে যে কালিমা তা এই তাওহীদের কালিমা৷ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ রসুল—এই মহান কালিমাতে পূর্ণরূপে সমর্পণই মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায়৷

২

কালিমায়ে তাওহীদ, এটি কোন মন্ত্র কিংবা জাদুবাক্য নয়৷ যা পাঠ করা মাত্রই জাদুবলে একজন ‘বোতল বন্দি মানুষ’ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে৷ বরং একত্ববাদের কালিমা হলো রবের সাথে কৃত একটি চুক্তি; একটি অঙ্গিকার৷ তাওহীদের কালিমা মেনে নেয়ার অর্থ হলো—স্বীকারোক্তি প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ‘ইলাহ’ নেই৷ ইবাদাতের উপযুক্ত সত্তা কেবল তিনিই৷ এবং সেই ইবাদতও হতে হবে তাঁর প্রেরিত রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের বর্ণিত পথ ও পদ্ধতির অনুসরণে৷ যিনি তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল৷ আর এই অঙ্গিকারের পূর্ণতা সাধনের সমান্তরালেই নির্ধারিত হবে মহান রবের কাছে আপনার প্রিয় হওয়া কিংবা না হওয়া৷

৩

তাওহীদ দুই প্রকার৷

এক: এ’তেক্বাদী

দুই: আমালী

৪

তাওহীদে এ’তেক্বাদী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—অন্তরে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করে নেয়া যে, এই জগতের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান তাবৎ বস্তুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ৷ ইবাদাতের হকদার একমাত্র তিনিই৷ তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই৷ নেই তার কোন অংশীদার৷ সত্তাগত বিবেচনায় তিনি একক এবং তিনি একক গুণগত বিবেচনায়৷ তার সত্তার যেমন দ্বিতীয়টি নেই তার গুনাবলী ধারণ করে এমনটিও দ্বিতীয় কেউ নেই৷ তিনিই রিযিকদাতা৷ আর কেউ নেই যে রিযিক দেবার ক্ষমতা রাখে৷ তিনিই আরোগ্যদানকারী৷ তিনি ভিন্ন দ্বিতীয় কেউ নেই যে অসুস্থের রোগমুক্তি দান করতে পারে৷ কারও কোনো উপকার করার ক্ষমতা কেবল তাঁর৷ তিনি ছাড়া আর কারও সমর্থ নেই কারও সামান্য ক্ষতি করার৷ তিনিই বিপদ দানকারী৷ বিপদ থেকে উদ্ধারকারীও তিনি৷ রাব্বুল আলামিনের সত্তাগত ও গুণগত একত্ববাদের নামই তাওহীদে এ’তেক্বাদী৷

৫

তাওহীদে আমালী বলা হয়—মা’বুদ হিসাবে তিনি এক ও অদ্বিতীয়৷ তিনি ছাড়া ইবাদাতের উপযুক্ত আর কেউ নেই এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করে তাঁর হুকুম পালন করে যাওয়া৷ সর্বাবস্থায় প্রস্তুত থাকা মহান রবের ইবাদাতের জন্য৷ তাঁর আনুগত্য সর্বাগ্রে৷ তাঁর হুকুমের সামনে অন্য তাবৎ হুকুমকে তুচ্ছ জ্ঞান করা৷ রবের নির্দেশিত যে কোন হুকুম যথাযথ পালনের জন্য সর্বাবস্থায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা৷

৬

তাওহীদে আমালীর বদৌলতে একজন মানুষ তার জীবনের সকল কাজে আল্লাহর নির্দেশকে রাখে সর্বাগ্রে৷ সে সর্বদা লক্ষ্য রাখে—আমার এই পদক্ষেপে খোদা নারাজ হবেন না তো! তার মনে যদি সামান্য সন্দেহ জাগে যে, এই কাজে রব অসন্তুষ্ট হয়ে যেতে পারেন; নারাজ হতে পারেন তিনি আমার এমন পদক্ষেপে তাহলে সে তাৎক্ষণিক বিরত হয় এবং ফিরে আসে রবের সন্তুষ্টি হাসিলের পথে৷

৭

আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান সে ডরায় না কাউকে৷ কারও দিকে প্রত্যাশাভরা দৃষ্টিতে দৃষ্টিপাত করে না৷ তার হাত প্রসারিত হয় না কোনো ‘মুখাপেক্ষি’র সমুখে়৷ কারও রক্তচক্ষু সামান্য টলাতে পারে না তাকে মহান রবের নির্দেশিত পথ থেকে৷ অযাচিত কামনার সমুদ্রে অবগাহন করার ভ্রম পেয়ে বসে না তাকে৷ সর্বাবস্থায় তার ভরসার স্থল হয়ে হৃদয়ে জ্বাজ্যল্যমান থাকে সেই নির্মুখাপেক্ষীর দুয়ার যার দুয়ার থেকে কেউ ফেরে না খালি হাতে৷

৮

কবি শেখ সাদী বলেন—একত্ববাদে বিশ্বাসীর পায়ের কাছে দুনিয়ার সোনা-রূপা স্তুপ করে রাখো, কিংবা উত্তোলিত করে রাখো তার কাঁধের ‘পরে খোলা তলোয়ার৷ আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে না তার প্রত্যাশা আছে, না আছে তার হৃদয়ে তিনি ছাড়া আর কারও সামান্য ‘ভয়-ডর’৷ এটাই তাওহীদ৷ এটাই এক আল্লাহতে পূর্ণ বিশ্বাস৷

৯

হৃদয়ে তাওহীদ ও একত্ববাদ বদ্ধমূল করার একমাত্র মাধ্যম হলো—ইলম৷ কালিমায়ে তাওহীদ মেনে নেয়ার ফলে একজন মুমিনের ওপর আবশ্যকীয়তা কী—ইলম ছাড়া তা কোনোভাবেই জানা সম্বব নয়৷ এজন্যই ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ৷ আবশ্যিক কর্তব্য৷

১০

ঈমান গ্রহণের পর প্রতিটি মুসলমানের আবশ্যিক কর্তব্য হলো সে অনুসন্ধান করবে—কীসে মহান রবের সন্তুষ্টি আর কোন কাজে তাঁর নারাজি৷ তারপর সে সর্বাত্মক চেষ্টায় ব্রতী হবে—রবের সন্তুষ্টিমূলক কাজে প্রয়াসী হবার এবং তার অপছন্দের সকল কাজ থেক বিরত থাকবার৷

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ভয় করো আল্লাহকে৷ আর সত্যবাদীদের সংস্পর্শ অবলম্বন করো৷”

— সুরা তাওবা: ১১৯

১১

বিপুল বিস্ময়কর এক সম্পর্ক আল্লাহ তায়ালা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি করে দিয়েছেন৷ একজন মুসলমান, সে প্রাচ্যের হোক কিংবা পাশ্চাত্যের, তার ভাষা বোধগম্য হোক কিংবা দুর্বোধ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি-গোত্রীয় শিষ্টাচার পরিচিত হোক কিংবা অপরিচিত কিন্তু যখনই জানতে পারি সে মুসলমান, সে ওই কালিমা স্বীকার করে নিয়েছে তাওহীদের যে কালিমা আমারও আত্মার আশ্রয় এতসব ভিন্নতা সত্বেও তাকে আপন মনে হয়৷ আত্মার আত্মীয় যেন৷ তার জন্যে হৃদয়ের গহীনে কোথাও বোধ করে উঠি ভালোবাসার নরোম কোমল উষ্ণতা৷

১২

আল্লাহ তায়ালা আমাদের পরস্পরকে নানান সম্পর্কের বাঁধনে বেঁধে দিয়েছেন৷ কিন্তু এতসব বন্ধনের মধ্যে সবচে’ মজবুত বন্ধনটি এই কালিমার বন্ধন৷ যা কখনও ছিন্ন হবার নয়৷ এ সম্পর্ক এমনই যা কখনও মুছে যাবার নয়৷ রক্তের সম্পর্কেও চিড় ধরে কখনও, দেখা দেয় অনাকাঙ্খিত ফাটল; কিন্তু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র মধ্যস্থতায় যে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি আমরা পরস্পরে তাতে কখনও ফাটল ধরে না৷ তা অটুট ও অমলিন থাকে চিরদিন৷

১৩

তাওহীদের কালিমায় বিশ্বাসী যত মুসলমান ছড়িয়ে আছে পৃথিবীময় তারা পরস্পরের আত্মার আত্মীয়৷ হয়তোবা দেখা হয় না তাদের একের সাথে অন্যের, হয়তোবা তাদের মাঝে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে কোনো বিশালাকার পর্বত, হয়তোবা উত্তাল সমুদ্দুর বাঁধা হয়ে আছে তাদের প্রাত্যহিক সাক্ষাতের পথে তবু মহান রব এমন এক অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধে রেখেছেন আমাদের পৃথিবীর কোনো শক্তি যে বাঁধন আলগা করবার ক্ষমতা রাখে না৷ সে বাঁধন একত্ববাদের কালিমা: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ৷

১৪

মহান রবের আদেশের সমুখে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করা এবং তাঁর প্রেরিত রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন পূর্ণাঙ্গরূপে অনুসরণ করার সদিচ্ছা পোষণ করাই তাওহীদের কালিমার দাবী৷

১৫

এই কালিমা তার স্বীকারোক্তি প্রদানকারী ব্যক্তির থেকে দাবী করে—তার যাবতীয় আচরণ, শিষ্টাচার, পারস্পরিক লেনদেন সব পরিচালিত হবে মহান রবের ইচ্ছানুযায়ী৷ ব্যক্তি জীবন, পারবিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন কিংবা রাষ্ট্রীয় জীবন সর্বত্র সমুখে রাখতে হবে রবের বিধান৷ মহান রবের নির্দেশ এবং তাঁর রাসুলের হেদায়েত ব্যতিরেকে মুসলামান তার একটি পদক্ষেপও গ্রহণ করবে না৷ তার চোখের পলক ফেলবে রবের সন্তুষ্টির কথা মাথায় রেখে৷ বাজারে চলাফেরা করবে তাঁর নজরদারির কথা চিন্তায় রেখে৷ ইবাদাত করবে সেটাও তার নির্দেশিত রীতি-পদ্ধতির অনুসরণে৷ এটাই এই কালিমার দাবী৷

১৬

তাওহীদের এই কালিমা মেনে নেয়ার অর্থ হলো আল্লাহ তায়ালার সাথে একটি অঙ্গিকারে আবদ্ধ হওয়া: জীবন পরিচালিত হবে রবের নির্দেশনানুযায়ী৷ এমন যেন না হয়—মুখে কালিমা উচ্চারণ করে জীবন পার করে দিলাম আর শেষ বিচারের দিন মহান রবের সমুখে দাঁড়াতে হলো তাঁর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গের লজ্জা নিয়ে৷ অঙ্গীকার ভঙ্গকারীকে তিনি পছন্দ করেন না—এ আপ্তবাক্য যেন সদা জাগরূক থাকে আমাদের হৃদয়ে৷

১৭

এই কালিমাকে যে গ্রহণ করে তার জীবন চলার পাথেয় রূপে, যে সচেষ্ট হয় কালিমার দাবী রক্ষার মহান ব্রতে তার হৃদয়ে সদা ভাস্বর থাকে আল্লাহ তায়ালার ভয়৷ তার প্রতিটি চাউনি পর্যন্ত হয়ে ওঠে সতর্ক৷ রাব্বুল আলামিনের প্রতি এমন ভয় কাতুরে থাকার নাম হলো—তাকওয়া৷ খোদাভীতি৷

১৮

সমস্ত কোরআনের সারসংক্ষেপ—হে ঈমানদারগণ! তোমরা তাকওয়া অর্জন করো৷

১৯

তাকওয়া—এটি ফার্মাসিস্টের আবিস্কৃত কোনো ক্যাপসুল নয় যা গিলে নিলে হৃদয়ে খোদাভীতি বাসা বাঁধবে৷ কিংবা তাকওয়া নয় কোনো সুপেয় পানীয় যা ঢকঢক গলঃধকরণ করলেই অন্তরে খোদার ভয় মুহূর্তেই চাঙ্গা হয়ে উঠবে৷ বরং তাকওয়া তৈরী হয় ‘সত্যবাদীর’ পবিত্র সংস্পর্শে৷

২০

‘সত্যবাদী’ কেবল সেই নয় যে সত্যভাষী, মিথ্যা ভাষণে অনভ্যস্ত৷ বরং ‘সত্যবাদী’ সেই যার ভাষণ সত্য, যার আদান প্রদান সত্য, যে মহান রবের সাথে কৃত অঙ্গীকার রক্ষার্থে একনিষ্ঠ৷ এমন ‘সত্যবাদী’র সাথে অতিবাহিত হয় যার ‘রাত্র-দিন’ তাকওয়া নোঙড় গাড়ে তারই হৃদয়-বন্দরে৷

২১

রাসুলের অনুসারী, সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন খোদাভীতির উৎকৃষ্ট আদর্শ৷ পরবর্তীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে খোদাকে তদ্রুপ ভয় করবার জন্যে যেরূপে ভয় করতেন তারা৷ আর এই বিরলপ্রজ তাকওয়া তারা অর্জন করেছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংস্পর্শে; পৃথিবী যার চে’ ‘সত্যবাদী’ পায়নি কো আর৷

২২

এটা কোন অসাড় দাবী নয়—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সংস্পর্শে তৈরি হয়েছিল সাহাবাদের যে দল তারচে’ অধিক খোদাভীরু আর কাউকে দেখবে না পৃথিবী৷

২৩

এই নশ্বর পৃথিবীর কোন মূল্য ছিল না তাদের চোখে৷ তাদের হৃদয়ে সদা জাগরূক থাকতো—মরেই তো যেতে হবে একদিন৷ গিয়ে দাঁড়াতে হবে মহান প্রভুর সমুখে৷ এই জীবন কিছুই নয়৷ মৃত্যুর পর যে জীবন সেটাই অনন্ত৷ কী হবে এই নশ্বর জীবনের মোহে পড়ে সেই অনন্ত জীবন ভুলে থেকে! কী হবে মহান প্রভুর সম্মুখস্থ দাঁড়াবার কথা ভুলে প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে জীবন অতিবাহিত করে!

২৪

এই যে ভয়—যা সন্ত্রস্ত করে রাখতো সর্বদা নবিজীর সাহাবাদের সেই ভয়-কাতরতা তাদের হৃদয়ে বাসা বেঁধেছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই পবিত্র সান্নিধ্যে৷ সামান্য ক’টা দিন তারা পেয়েছিলেন তাঁকে৷ সেই সামান্য দিনের সংস্পর্শেই এমন তাকওয়া তারা হৃদয়ে ধারণ করে নেন যা পরবর্তী সকলের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত৷

২৫

কেবল বই পত্তরের পৃষ্ঠা উল্টে কিংবা সভা-সেমিনারে চিত্তাকার্ষক বক্তব্য শুনে এই তাকওয়া অর্জিত হয় না৷ তাকওয়ার নির্যাস দিয়ে হৃদয়কে ভেজাতে হলে তাওহীদের কালিমা ও তার দাবী জীবনে চিত্রায়ণ করে এমন খোদাভীরুর সংস্পর্শে যেতে হয়৷ তার সান্নিধ্যে কিছুকাল থেকে গভীরভাবে দেখতে হয় তার জীবনাচার৷ রোনাজারী শিখতে হয় তার শেষ রাতের ফরিয়াদ থেকে৷ ইবাদতের একাগ্রতা শিখতে হয় তার ইবাদতের আন্তরিকতা দেখে৷ কেমন তার হেঁটে চলা, কেমন তার কথা বলা, কেমন তার হাসি, কেমন তার কান্না—সবকিছু অনবরত দেখে যেতে হয় পাশে থেকে; গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে৷ তাকওয়া অর্জনের পন্থা এটাই৷ এভাবেই যুগে যুগে তাকওয়ার স্থানান্তর ঘটেছে হৃদয় থেকে হৃদয়ে৷

২৬

প্রায়শই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে—বর্তমান সময়ে এমন ‘সত্যবাদী’ কোথায়? কোথায় সে জন যে পূর্ণতা দানে সচেষ্ট রবের সাথে কৃত তাবৎ অঙ্গিকারের? কালিমার দাবী পূরণ করছে এমন পাই না তো খুঁজে কাউকে! কোথায় সে জুনায়েদ বাগদাদী যার এক দৃষ্টিপাতে জীবনের মোড় বদলে যায়! কোথায় সেই শিবলী যার ক্ষণিকের সান্নিধ্যে অতিশয় গোনাহগারও রূপান্তরিত হয়ে যায় পরশ পাথরে! এখন তো সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি৷ এর মধ্যে কোথায় পাব আমি সেই পবিত্র-হৃদয় ‘সত্যবাদী’কে যার সংস্পর্শ আমার জীবন আমূল বদলে দেবে!

২৭

আমার শ্রদ্ধেয় পিতা তার জীবদ্দশায় অসংখ্যবার প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছেন৷ এবং বোধ করি—সব যুগেই প্রশ্নটি উচ্চারিত হয়েছে গোচরে কিংবা অগোচরে৷ আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজান বলতেন—মানুষ খুবই আজিব এক প্রাণি৷ সে নিজে গোণাহের অতলান্তিক সমুদ্রে আছে ডুবে; তার একটি মহূর্ত অতিক্রান্ত হয় না গোনাহের সঙ্গ ছাড়া; পাপাচার যার কাছে নিত্যকার খানা-খাদ্য গ্রহণের মতো স্বাভাবিক সেও সান্নিধ্য গ্রহণের জন্য ‘সত্যবাদী’ খোঁজে জুনায়েদ বাগদাদীর মতো৷ সেও আত্ম সংশোধনের জন্য ‘মুরশিদ’ কল্পনা করে বায়েজীদ বোস্তামি কোনো৷ অথচ তার কর্তব্য ছিল—তার স্তরের কোন মুরশিদ খুঁজে নেয়া৷ যেমন রূহ ফেরেশতাও তো সেই স্তরেরই হওয়া চাই!

২৮

খাদ্যের বেলায় তো আমরা এ কথা বলে বসে থাকি না৷ সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি—তাই বলে তো আমরা শুদ্ধতার অনুসন্ধানে নিবৃত্ত হই না৷ দূর দূরান্তে লোক পাঠিয়ে খাঁটি গাওয়া ঘি আনিয়ে রসনাকে তৃপ্ত করি৷ কোথায় ‘পিওর’ মধু পাওয়া যাবে তার সন্ধানে তাবৎ মাধ্যম ব্যয়িত করি৷ শত মাইল পেরিয়ে, শত বাঁধা মাড়িয়ে গোয়ালার দুয়ারে গিয়ে হাজির হই এক পেয়ালা বিশুদ্ধ দুধে চুমুক দিতে৷ এই ভেজালের জামানায়ও শুদ্ধতা খুঁজে নিতে আমরা সাধ্যাতীত পরিশ্রম স্বীকার করে নিই৷ সবই করি পাকস্থলির সুস্থতার জন্যে; শরীরের ‘সংশোধনে’র জন্যে৷ তবে আত্মার সংশোধনে কেন নয়! কেন আত্মার শুদ্ধি করণের জন্য ‘নির্ভেজাল মুরশিদ’ আমি খুঁজে নেব না৷ কেন একজন ‘সত্যবাদী’র অন্বেষায় আমি মাড়াবো না শতেক মাইল পথ!

২৯

সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করে যদি নাইবা পাওয়া যায় তেমন কোনো সত্যবাদী যার হাতে হাত রেখে ‘দুনিয়া’ ভুলে যাওয়া যায়৷ যার সান্নিধ্যে কিছুকাল অতিক্রান্ত করলে ‘আখেরাত’ চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে হৃদয় তবে, মসজিদের মুয়াজ্জিনকে বেছে নিতে হবে৷ তার সান্নিধ্যেই অতিবাহিত হোক জীবনের কিছু সময়৷ সে দৈনিক পাঁচবার আল্লাহর নাম উচ্চকিত কণ্ঠে উচ্চারণ করে, সে মানুষকে আহ্বান করে চির কল্যাণের দিকে, মহান সফলতার দিকে তার সান্নিধ্য ব্যর্থ হবার নয়৷ আত্মার সংশোধন তার সংস্পর্শেও হতে পারে৷

৩০

তবে, সান্নিধ্য গ্রহণের জন্য কোনো মহৎ-প্রাণ ‘সত্যবাদী’র সন্ধান মিলবে না—এমন হবার নয়৷ যার সংস্পর্শ গোনাহের সমুদ্রে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ব্যক্তির নসীব বদলে দিতে পারে; জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দিতে পারে যার নরোম কোমল স্পর্শ—এমন ‘মানুষ’ পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে৷ আমাদের একটু উদ্যোগী হয়ে খুঁজে নিতে হবে, এই যা! আত্মার সংশোধনের জন্য এতটুকু পরিশ্রম তো করতেই হয়! এবং সে পরিশ্রমটুকু আমাদের করতেই হবে৷

“যে ব্যক্তি কিছু দান করলে তা করে আল্লাহর জন্য, দান করা থেকে নিবৃত্ত থাকলেও তা হয় আল্লাহরই জন্য, কাউকে ভালোবাসলে আল্লাহর জন্যই ভালোবাসে, অপছন্দ করার প্রয়োজন হলেও সেটা হয়ে থাকে আল্লাহরই জন্য—এমন ব্যক্তির ঈমান পূর্ণতা প্রাপ্ত৷”

—তিরমিযী৷

৩১

একজন মানুষ, সে নিজের জন্যে ব্যয় করে, পরিবারের জন্যে ব্যয় করে আবার সে তার সম্পদ ব্যয় করে এমনও কারুর জন্যে যে নয় তার আত্মীয়৷ এই যাবতীয় ব্যয়ের সময় সেই মানুষটির উচিত আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির নিয়ত করা৷ সাদাকাহ, দান, খায়রাত ইত্যকার ব্যয়ের সময় মানুষের সমুখে তো রবের সন্তোষ অর্জনের সদিচ্ছা থাকেই; উল্লিখিত সমুদয় ব্যয়ের সময়ও যদি তার সামনে রবের সন্তুষ্টি অর্জন উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে যা ব্যয় করছে সে নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে এবং নাম-গোত্র-পরিচয়হীন মানুষটির জন্যে সব কিছুর বিনিময় জমা পড়ে যাবে আল্লাহর কাছে৷ আল্লাহ তায়ালা তাঁর উদ্দেশ্যে ব্যয়িত সম্পদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না৷

৩২

পরিবারের ভরণ-পোষণ পরিবার-কর্তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব৷ সে এই আবশ্যকীয় দায়িত্ব পালনের সময় যদি একবার কল্পনা করে নেয়—(যেমন ধরুন) পরিবারের জন্যে এই গোশতটুকু কিনছি যেন আল্লাহ খুশি হন৷ তবে এই পরিবার-কর্তা তার প্রতি কাজে দ্বিগুণ সাওয়াব লাভ করবে৷ পরিবারের ভরণ-পোষণের আবশ্যকীয় দায়িত্ব সম্পন্ন করবার জন্যে এবং সেই কাজটি আল্লারই সন্তোষ লাভের আশা নিয়ে যে করেছে, সেই জন্যে৷ মনে রাখবেন—প্রতিটি কাজের বিনিময় প্রাপ্তি নির্ভর করে কর্তার ‘ইচ্ছে’র ওপর৷

৩৩

আমার মুরশিদ আবদুল হাই-আল্লাহ তায়ালা তার কবরে শীতলতা দান করুন-বলতেন—কোনো কাজ দুনিয়া কিংবা দীন হওয়া অনেকাংশেই নির্ভর করে দৃষ্টি ভঙ্গির ভিন্নতার ওপর৷ খাদ্য গ্রহণ, নিদ্রা যাওয়া, ওঠা-বসা করা—এসব নিছক দুনিয়া-সংশ্লিষ্ট কাজ৷ কিন্তু যদি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে চিন্তা করা হয়—“তোমার শরীরের হক রয়েছে” নবিজীর বর্ণিত সেই হক আদায়ের জন্যে আমি খাদ্য গ্রহণ করি, নিদ্রা যাই; তবে, নিঃসন্দেহে আমার ঘুম, আমার আহার কিছুই নিষ্ফল নয়; এসবের বিনিময়েও রবের কাছে আমার জন্যে নির্ধারিত হবে প্রতিদান৷

৩৪

উপহার-উপঢৌকন, হাদিয়া হতে হবে ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ৷ নিছক সামাজিকতা রক্ষার্থে হাদিয়া প্রদান অনুচিত এবং আল্লাহ তায়ালার নিকট অপছন্দনীয়৷ অমুক অনুষ্ঠানে খালি হাতে গেলে ইজ্জত থাকবে না—এই অনুভূতি নিয়ে হাদিয়া প্রদান নিন্দনীয়৷ এমতাবস্থায় যদি হাদিয়া প্রদান থেকে নিরস্ত থাকা হয়, এবং এই নিরস্ত থাকাটা যদি হয়ে থাকে কেবল আল্লাহ তালারই সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে তবে সে মহান রবের নিকট এর বিনিময়ে লাভ করবে প্রভূত কল্যাণ৷

৩৫

আলেম-উলামা ও আল্লাহ ওয়ালা বুজুর্গদের সাথে সম্পর্ক তৈরীর এবং তা রক্ষা করে চলবার একটিই উদ্দেশ্য হতে হবে—আল্লাহ তায়ালার সন্তোষ লাভ৷

৩৬

কখনও-সখনও শয়তান আমাদের ধোঁকায় ফেলে দেয়৷ আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক রক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে দুনিয়া-লাভ৷ আমাদের হৃদয়ে এই সুখানুভূতি জেগে ওঠে—আমি অমুক বুজুর্গের সাথে যদি সম্পর্ক রেখে চলি লোকে আমায় ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনা করবে৷ সবখানে আমার কদর হবে৷ সম্মানিত হয়ে উঠব আমি মানুষের চোখে৷ আর যদি তার একান্ত খাদেম হতে পারি তবে তো কথাই নেই! মূল্যবান হাদিয়া তোহফা সব আমার হাতে আসবে! কিংবা উদ্দেশ্য যদি হয়—বুজুর্গ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে আমি অমুক পদ বাগিয়ে নেব৷ আমার অমুক কাজটা হাসিল করে নিতে পারব তার সাথে সম্পর্কের দোহাই দিয়ে! আল্লাহ তায়ালার কাছে পানাহ চাই৷ বুজুর্গ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রক্ষার উদ্দেশ্য যদি এমনই হয়ে থাকে তবে নিজেকে এখনই শোধরে নেয়া উচিত৷ নতুবা এই সম্পর্ক আল্লার তায়ালার নারাজি ডেকে আনবে৷

৩৭

আমাদের মধ্যকার যাবতীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি৷ মা-বাবার প্রতি আমার হৃদয়ে যে নিখাঁদ ভালোবাসা, স্ত্রী-সন্তানের প্রতি যে সুতীব্র প্রেম, ভাই-বোন, বন্ধু-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর জন্যে হৃদয়ের গহীনে যে টান, যে মায়া তার সব হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্যে৷ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ ব্যতিত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যদি হয়ে থাকে আমার ইশক-মুহাব্বাত-ভালোবাসা তবে মহান রবের দরবারে তার কানা কড়িও মূল্য নেই৷

৩৮

কারুর সাথে আমার সম্পর্ক, কারুর প্রতি আমার হার্দিক আকর্ষণ কিংবা কারুর জন্য আমার ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই সন্তুষ্টির জন্যে কিনা—জানার উপায় কী? উপায় হলো—তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে যদি আল্লাহ তায়ালার কোনো নারাজির কাজে জড়িয়ে পড়ি তবে কি তাকে আমি অবলীলায় ত্যাগ করতে পারছি? না, হৃদয়ের কোথাও বোধ করে উঠছি গভীর বেদন? এই অবলীলাক্রমে তাকে ত্যাগ করতে পারা ও হৃদয়ের গহনে কোন বিষাদ অনুভূত করে ওঠার মধ্যেই পরিমাপিত হয়ে যাবে—আমাদের মধ্যস্থিত সম্পর্ক আল্লাহ তায়ালার সন্তোষ হাসিলের জন্যেই ছিল কিনা!

৩৯

সবাইকে, সব কিছুকে কেবল আল্লাহরই জন্যে ভালোবাসা—এটা অনায়াস কাজ নয়৷ এর জন্যে প্রয়োজন সাধনা৷ দরকার অধ্যবসায়৷ অনবরত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এই গুণ আয়ত্ব করতে হয়৷

৪০

কাউকে ভালোবাসার পূর্বে, সম্পর্ক স্থাপনের মূহুর্তে নিয়তকে ঝালাই করে নিন৷ নিজেকে প্রশ্ন করুন—কেন তাকে আমি ভালোবাসবো? কেন তার সাথে আমি হার্দিক সম্পর্ক গড়ে তুলবো? কোন উদ্দেশ্যে তার সাথে আমার পথচলা? আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভেরই জন্যে তো!—এভাবে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে কাঠ গড়ায় হাজিরের মাধ্যমে সব কিছুকে, সবাইকে কেবল আল্লাহ তায়ালারই জন্যে ভালোবাসার এই মহৎ গুণ নিজেতে স্থাপিত করে নিতে হবে৷

৪১

কারও ব্যক্তিসত্বার প্রতি ঘৃণা পোষণ করা যাবে না৷ কাউকে অপছন্দ করতে হলে তার ওই কাজটিকে কিংবা তার ওই কথাটিকে অপছন্দ করতে হবে যেই কাজ কিংবা কথা আল্লাহ তায়ালার অসুন্তুষ্টির কারণ হতে পারে৷

৪২

ঘৃণা কাফেরের প্রতি নয়; তার কুফুরীর প্রতি৷ ফাসেকের প্রতি নয়; তার ফিসকের প্রতি৷ গোণাহগার কে অপছন্দ করা যাবে না; অপছন্দ করতে হবে তার গোনাহটিকে৷ কুফুরী, ফিসক, গোনাহ—এসব একেকটি ব্যধি৷ আর ব্যক্তি সত্বা হলো রোগাক্রান্ত দেহ৷ ব্যধিকেই অপছন্দ করে তার চিকিৎসার আয়োজন করতে হয়৷ রোগাক্রান্ত দেহের প্রতি ঘৃণা জন্মে গেলে তার শুশ্রুষা হবে কোন উপায়ে?

৪১

সফলতা নির্ভর করে ব্যক্তির ঈমান ও আমলের ওপর৷

৪২

পার্থিব জীবনের সফলতাই ব্যক্তির সার্বিক সাফল্য নয়; প্রকৃত সফলতা লাভ করেছে সেই যে, পার্থিব ও অপার্থিব উভয় জীবনেই সফল হতে পারলো৷

৪৩

আল্লাহতে বিশ্বাসী ব্যক্তি মাত্রেরই অাবশ্যিক কর্তব্য—রোজকার পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ৷ ঈমান গ্রহণের পর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এই নামাজের ব্যাপারে৷ একজন বিশ্বাসী ব্যক্তির প্রকৃত সফলতা অর্জনের মাধ্যম এই নামাজ৷ কারুর নামাজ যত বেশি আন্তরিকতায় পূর্ণ; যত বেশি মনোযোগ সহকারে সে সিজদায় অবনত হয় মহান প্রভূর উদ্দেশে সে তত বেশি সফল৷ সাফল্যের চূড়া স্পর্শের জন্যে একজন মুমিনের প্রথম ধাপ—নামাজে তার খুশু’ এবং খুজু’৷ তার আন্তরিক মনোযোগ৷

৪৪

বর্তমান সময়ে অনেকের ভেতর আমি একটি বিস্ময়কর চিন্তা দেখে উঠি৷ এবং সত্যিই তাদের এই বিবেচনাবোধ আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করে৷ তাদের কেউ জিহাদের ময়দানে আছে, কেউ আছে দীনি দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানে৷ কেউবা আছে আবার যারা রাজনীতির ময়দানে কাজ করছে৷ তারা মনে করে—আমি তো দীনকে পৃথিবীর বুকে সমুন্নত করবার কাজে ব্যাপৃত৷ বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে আমি কাজ করে যাচ্ছি৷ আমার এই কাজের মধ্যে কখনও নামাজে খামতি চলে আসতে পারে৷ হতে পারে, জামাতে শামিল হতে পারলাম না৷ হতে পারে, নামাজ দুয়েক ওয়াক্ত কাজা হয়ে গেল৷ আর এই নামাজে খামতি এসে পড়ছে দীনের একটি বৃহত্তর খেদমাত আঞ্জাম দিতে গিয়ে৷ সুতরাং, যেহেতু এই কমতি হয়ে যাচ্ছে দীনেরই কোন কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ার কারণে অতএব আমার ওপর এর কোন প্রভাব পড়বে না৷ আমি মনে করি—এমন চিন্তা সুস্পস্ট ভ্রান্তি৷ যারা এই ভ্রান্তিতে ডুবে আছে তাদের এখনই গা ঝাড়া দিয়ে চৈতন্যে ফিরে আসা উচিত৷

৪৫

নিঃসন্দেহে আমরা উমার ইবনুল খাত্তাবের চাইতে বড় রাজনীতিক নই; নই তার চাইতে দরদী দায়ী! দীন সমুন্নত করবার জন্যে তার মতো মুজাহিদ আমাদের মধ্যে কে আছে! সেই তিনি -প্রাজ্ঞ রাজনীতিক, দরদী দায়ী এবং মহান মুজাহিদ- তার গভর্নরদের ফরমান পাঠিয়ে বলছেন—খবরদার! নামাজের ব্যাপারে কোনো অবহেলা নয়৷ নিঃসন্দেহে আমার নিকট নামাজের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই আর৷ যে নামাজের ব্যাপারে যত্নবান সে তার দীনের সংরক্ষণ করলো৷ আর যে নামাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করলো তার কাছে অন্য সমস্তের ক্ষতি করা তুচ্ছ ব্যাপার৷

৪৬

বিশ্বময় আজ অমুসলিমদের জয়জয়কার৷ সর্বত্র আজ তাদের উত্থান দেখি৷ কই, তারা গুরুত্ব সহকারে দৈনিক পাঁচবার নামাজ পড়ে এমন তো শুনিনি—এভাবে বিবেচনা করতে যাওয়াটা বিরাট বোকামি৷ মহান আল্লাহ নামাজকে বলেছেন মুমিনের সফলতা লাভের সিঁড়ি৷ এটা মেনে নিয়ে নামাজে যত্নবান হওয়াটাই মুমিনের ইমানের দাবী৷

৪৭

সফলতার জন্যে কেবল নামাজ আদায় যথেষ্ট নয়৷ বরং নামাজ হতে হবে খুশু’ এবং খুজু’র সাথে৷

৪৮

খুজু’ দ্বারা উদ্দেশ্য—শরীর আল্লাহ তায়ালার সমুখে পেশ করা৷ অযথা আন্দোলন থেকে বিরত থাকা৷ এমনভাবে স্থির থাকা যেন দূর থেকে নিথর স্তম্ভ মনে হয়৷ আর শরীরের প্রতিটি অঙ্গ স্থাপন করতে হবে সুন্নাত অনুসারে৷

৪৯

খুশু’—দেহের অভ্যন্তরীণ যে হৃদয় তাকে মহান রবের কাছে সঁপে দেয়া৷ নামাজের মধ্যে কেবল তাঁরই ধ্যানে ধ্যানী হতে হবে৷ তিনি ভিন্ন অন্য কারও চিন্তা মনে আশ্রয় দেয়া চলবে না৷

৫০

নামাজে দাঁড়াবার অর্থ—রাজাধিরাজের দরবারে দাঁড়িয়েছি আমি৷ আমার শরীর, আমার মন যেভাবে স্থির রাখি দুনিয়ার কোন সম্মানিত ব্যক্তির সম্মানার্থে সমানুপাতিক হারে তদ্রুপ স্থিরতা আনতে হবে নিজেতে৷ তবেই আমার নামাজ হবে খুশু’ এবং খুজু’ সমৃদ্ধ৷ যেই নামাজের প্রাপ্তি স্বরূপ ঘোষিত হয়েছে মহান সফলতা৷

৫১

জ্ঞানার্জনের জন্যে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যত মাধ্যম দান করেছেন তার একটি হলো—পঞ্চেন্দ্রিয়৷ চোখ, কান, নাক, জিহ্বা, স্পর্শানুভূতি—এগুলো একেকটি মাধ্যম৷ কোনো বস্তু দেখার মাধ্যমে, কোনো আওয়াজ শোনার মাধ্যমে, রসনা দ্বারা কোনো খাদ্যের স্বাদ আস্বাদনের মধ্য দিয়ে আবার কোনো বস্তু স্পর্শ করার সাহায্যে মানুষ সেইসব সম্পর্কে তথ্য লাভ করে৷ তার অজানাকে জানায় রূপান্তরিত করে৷ এগুলো তার একেকটি অবলম্বন৷ যা তাকে দান করেছেন তার মহান প্রতিপালক৷

৫২

উল্লিখিত মাধ্যমগুলো আপন ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ৷ আপনি চাইলেই চোখ দ্বারা শুনতে পারবেন না; চোখ বন্ধ করে কোনো বস্তু দেখে উঠতে পারবেন না কান দ্বারা৷ তদ্রুপ কেউ রসনার ব্যবহারে খাদ্যের স্বাদ আস্বাদনে যতই পারঙ্গম হোক না কেন তা দ্বারা সে দেখা এবং শোনার কাজ চালাতে পারবে না৷ কারণ রসনার কাজ কেবল স্বাদ গ্রহণ৷ যেভাবে চোখ এবং কান সীমাবদ্ধ দেখা এবং শোনার ভেতর৷

৫৩

মানুষের পঞ্চেন্দ্রিয়ের বাইরে জ্ঞানার্জনের আরেকটি মাধ্যম আল্লাহ তালা তাকে দান করেছেন৷ কিছু বিষয় আছে এমন যা চোখে দেখা যায় না, কানে শোনা যায় না; যার কোনো স্বাদ, রঙ, গন্ধ নেই৷ যা হাত দ্বারা স্পর্শ করেও অনুভূত হয় না৷ সেই সব বিষয়ের জ্ঞান আহরণের জন্যে আল্লাহ তায়ালা এই মাধ্যমটি মানুষকে দিয়েছেন৷ আর সেই মাধ্যমটি হলো—আকল৷ মানুষের বুদ্ধি ও বিবেচনাবোধ৷

৫৪

তবে পঞ্চেন্দ্রিয় ও এই আকলের মধ্যে একটা সাজুয্য রয়েছে: পঞ্চেন্দ্রিয়ের যেমন রয়েছে কিছু সীমাবদ্ধতা, আপন ক্ষেত্রের বহির্ভূত বিষয়ের জ্ঞান লাভের জন্যে যেমন সে অবলম্বন হতে পারে না; তেমনি আকলও৷ মানুষের আকল, তার বোধ, বুদ্ধি ও বিবেচনাও একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ৷ তারও একটি সীমারেখা আছে; যা সে উতরে যেতে পারে না৷

৫৫

তবে জ্ঞান পিপাসু মানুষের নিরাশ হবার কিছু নেই৷ কোনো জিজ্ঞাসার সমাধান যদি তার আকল দিতে ব্যার্থ হয়, যদি সে তার কোনো সংশয়ের উত্তর খুঁজে না পায় তার বোধ, বুদ্ধি কিংবা চিন্তার কাছে তার সংশয় নিরসনের জন্যে আল্লাহ তায়ালা তৃতীয় একটি মাধ্যম দান করেছেন৷ তা হলো—ওহীয়ে ইলাহী৷ আল্লাহ তালার পক্ষ থেকে প্রেরিত ফরমান৷ মূলত আকল যেখানে থমকে যায় সেখানেই শুরু ওহীয়ে ইলাহীর দিক নির্দেশনা৷

৫৬

কোনো ব্যক্তি যদি গোঁ ধরে—আমি ওহীর কোনো বার্তা মেনে নিব না যতক্ষণ না আমার বিবেক তা সমর্থন করে৷ বিবেক দ্বারা সমর্থিত হলেই কেবল আমি সেই আসমানী ফরমান সত্য বলে মেনে নিব৷ তবে, এটা হবে তার চরম নির্বুদ্ধিতা৷ যেমন এ কথা বলাটা হবে তার নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক যে, কোনো বিষয় আমি তখনই স্বীকার করে নিব আমার কান যখন তা দেখতে পারবে৷ দেখার মাধ্যমে জ্ঞানার্জন যেমন কানের কাজ নয় তদ্রুপ এমন বিষয় অজস্র যা সম্বন্ধে তথ্যার্জনের মাধ্যম নয় আমাদের বোধ-বুদ্ধি কিংবা আকল৷

৫৭

বিবেক মানুষের সব চাইতে বড় আদালত—কথাটি সর্বাংশে সত্য নয়৷ সবার বিবেক কি সঠিক সিদ্ধান্ত দানে সমর্থ রাখে? তাহলে?

৫৮

ভালো-মন্দের চূড়ান্ত ফায়সালা মানুষের বিবেক করতে পারে না৷ বিবেক কিংবা আকল সিদ্ধান্ত নিতে পারে না কোনটা মানব জীবনের জন্যে কল্যাণকর আর কোনটাতে রয়েছে তার জন্যে অকল্যাণ৷ হালাল-হারামের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও আকলের নেই৷ এসব বিষয়ে ওহীর দারস্থ হতেই হবে মানুষকে৷

৫৯

পৃথিবীময় যত অকল্যাণের বিস্তার আমরা দেখে উঠি তার সবটার উৎস ওহীর ফরমান বিবর্জিত আকল৷

৬০

যে বিষয়ে ওহীয়ে ইলাহির নির্দেশনা আছে, প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে কোনো না কোনো সমাধান রয়েছে আসমানী বার্তায় সেখানে বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করতে গেলেই মানুষ বিভ্রান্তিতে জড়িয়ে পড়বে৷ আর, কোন এমন সমস্যা আছে যার সমাধান দিতে পারে না প্রভূর প্রেরিত ফরমান!

৬১

আমাদের এক দুর্ভাগ্যের কথা বলি—আমরা আজ মুসলমান কেবল মসজিদে৷ জামাতের সাথে পাঁচ বার নামাজ আদায় করছি, রমজান এলে তোড়জোড়ের সাথে রোজা রাখছি, ঘটা করে জাকাত প্রদান করছি, হজ করছি ফি বছর৷ কিন্তু বাজারে আমরা মুসলমান নই; অফিসে পারছি না নিজের মুসলমানিত্ব জাহির করতে৷ করছি না পরিবারস্থ লোকেদের ক্ষেত্রেও৷ ফলে আমাদের ইসলাম পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না৷ আল্লাহ তায়ালা যে আহ্বান করেছেন—“তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো” সেই পরিপূর্ণরূপে প্রবেশটা হয়ে উঠছে না৷

৬২

ইসলামের পাঁচটি অংশ:

(১) আকায়েদ৷

(২) ইবাদাত৷

(৩) মুআমালাত৷

(৪) মুআশারাত৷

(৫) আখলাক৷

৬৩

ইসলামকে পূর্ণরূপে যদি নিজের মধ্যে ধারণ করতে হয় তবে পূর্ণতা প্রদান করতে হবে এই পাঁচটি বিষয়েরই৷ কারুর কোন একটি দিক অপূর্ণ থাকলে তার ইসলামে প্রবেশও অংশত বলে ধরে নেয়া হবে৷ তাকে বলা হবে না পরিপূর্ণ মুসলিম৷

৬৪

নিজেকে আল্লাহ তালার সামনে পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হিসেবে উপস্থিত করবার জন্যে আকিদা-বিশ্বাস হতে হবে বিশুদ্ধ৷ ইবাদাতের মধ্যেও কোনো ত্রুটি থাকতে পারবে না৷ কেনা-বেচা, আর্থিক লেন-দেন হবে স্বচ্ছ; অস্বচ্ছ কিংবা অবৈধ কোনো কারসাজি থাকবে না তার লেন-দেনে৷ তদ্রুপ, অপরের সাথে তার নিত্যকার আচার-ব্যবহার হবে অমায়িক; কথা কিংবা কাজে সে কারও হৃদয় চূর্ণ করবে না৷ পরিপূর্ণ মুসলিম যে হবে তার অভ্যন্তরীণ আখলাক-চরিত্রও হবে ফুলের মতোন৷ সুঘ্রাণে-সুবাসে মোহময় করে রাখবে চারপাশ৷

৬৫

সত্যিকার মুসলিম হৃদয় কখনও বিস্মৃত হবে না—আল্লাহ তালা আমাকে দেখছেন৷

৬৬

আবদুল্লাহ ইবনে উমার বলেছেন—যতদিন মানুষের হৃদয়ে জাগরূক থাকবে “আল্লাহ আমাকে দেখছেন” ততদিন তার থেকে কোন অবিচার সংঘটিত হবে না৷

৬৭

হৃদয় খুঁড়ে কথাটি সেখানে বিদ্ধ করে নিন—শূকর খাওয়া যেমন অন্যায়, মদ পান যেমন অন্যায়, এসবের বিনিময়ে যেমন ভোগ করতে হবে শাস্তি; কাউকে কষ্ট দেয়া, কারও হৃদয় আঘাতে জর্জরিত করা তদ্রুপ অন্যায়৷ কিন্তু শূকর ভক্ষণ ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকলেও কাউকে কষ্ট দেয়া থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারি না৷

৬৮

হুকুকুল ইবাদ, অপর মুসলমানের হক আদায় করার প্রতি ইসলাম বিস্ময়কর গুরুত্বারোপ করেছে৷ ইসলামকে যে আজ আমরা পৃথীবিময় বিস্তীর্ণ দেখি তা কেবল জিহাদ আর দাওয়াতের মাধ্যমে হয়নি৷ তার পেছনে ছিল মুসলমানের উত্তম আখলাখ৷ মুসলমানের সুবাসিত জীবনাচার, অন্যের সাথে তার মুগ্ধকর ব্যবহার ইসলামকে প্রোথিত করে দিয়েছে অজস্র অমুসলিমের হৃদয়ে৷ হৃদয় জয়ী হয়েছে তবেই না জয়ী হয়েছে দেশ, ভূ খণ্ড!

৬৯

মসজিদের মধ্যেই ইসলামকে সীমাবদ্ধ করে রাখবেন না৷ তাসবীহ জপা আর আল্লাহর নাম স্মরণ করাই কেবল ইসলাম নয়৷ ইসলাম আরও ব্যাপক৷ আরও বিস্তৃত৷ যা বিস্তৃত তাকে বিস্তৃত আঙ্গিনাতেই চর্চা করতে হবে৷ কোনো সীমায় তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হবে নির্বুদ্ধিতা৷

৭০

চলুন, অংশত নয়; বরং পূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করি৷

৭১

দীনের দিকে আসুন—এই বার্তা আজ মানুষের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে৷ মানুষ ভাবছে দীনের দিকে ধাবিত হওয়া বুঝি দুনিয়াকে ছেড়ে দেয়া৷ আসলে আদৌ তা নয়৷ দীন এবং দুনিয়া উভয়কে আজ সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী প্রমাণ করা হচ্ছে৷ যার পরিণতিতে মানুষ দীনের দিকে অগ্রসর হতে উদ্যোগী হয়ে উঠছে না৷ অথচ দীন দুনিয়াকে বর্জন করতে বলে না৷ দীন বরং দুনিয়া অর্জনে উৎসাহিত করে; তবে পার্থক্য এতটুকু—সেই অর্জনটা যেন দীন অনুযায়ী হয়৷ যেন হয় দীনের নির্দেশনা মেনে৷

৭২

ধরুন আপনার একজন গৃহ পরিচারক আছে৷ তাকে বললেন এক কেজি দুধ নিয়ে আসবার জন্যে৷ কিন্তু সে দুধ আনতে রাজি নয় যতক্ষণ না আপনার থেকে উত্তর পাবে কেন আপনি দুধ আনাচ্ছেন? দুধ আপনার কী কাজে দরকার? এখন বলুন, এই গৃহপরিচারকের প্রতি আপনার মনোভাব কেমন হবে? সন্তুষ্ট থাকতে পারবেন তার প্রতি? রবের সাথে আমাদের সম্পর্ক তেমনই, যেমন আপনার সাথে আপনার গৃহপরিচারকের৷ বরং আমাদের দাসত্ব, আমাদের বাধ্যবাধকতা তার চাইতে ঢের বেশি৷ এখন আমরা যদি রবের হুকুমের প্রতি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই! হারহামেশা যুক্তি দেখাই—কেন এমনটা করবো? তবে মহান রব কী সন্তুষ্ট থাকবেন আমাদের প্রতি?

৭৩

দীন পালন কঠিন নয়৷ দৈনন্দিনকার কাজে রবের সন্তোষের ইচ্ছা করবেন আর চেষ্টা করবেন তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বেঁচে থাকতে৷ ব্যাস, দেখবেন দীন পালন একদমই সহজ৷ কঠিন যা, একটু সদিচ্ছার৷

৭৪

অসুস্থাবস্থায় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বার সমর্থ না থাকলে নামাজ আদায় করতে হয় বসে বসে৷ তবু নামাজ পড়তেই হবে৷ কিন্তু এমতাবস্থায় অনেককেই সংকীর্ণমনা হয়ে পড়তে দেখি৷ অসুস্থতার কারণে বসে নামাজ আদায় করতে হচ্ছে বলে তারা নামাজের পূর্ণ সাওয়াব লাভ করছেন না—এমন এক হিনম্মন্যতায় তাদের ভুগতে দেখি৷ মূলত এটাও দীন সম্পর্কে কম জানাশোনার কারণে হয়ে থাকে৷ দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ে অসমর্থতার কারণে যে বসে নামাজ আদায় করছে, কিংবা নামাজ আদায় করছে শুয়ে কিংবা ইশারায় সে তদ্রুপ সাওয়াব লাভ করবে যেমন লাভ করছে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়কারী৷

৭৫

সংসারে কিছু মানুষ দেখি—যারা ইবাদাতে কেবল কাঠিন্য খুঁজে ফেরে৷ যে অবস্থায় ইসলাম কিছুটা স্বস্তিদায়ক পন্থা অবলম্বনের সুযোগ রেখেছে সে অবস্থাতেও তারা কঠিনেরেই ভালোবাসে৷ তাদের ধারণা—যত কঠিন পন্থা অবলম্বিত হবে ইবাদাতে, আল্লাহর আনুগত্যে যত কষ্ট স্বীকার করা হবে বিনিময় তত বেশি৷ নিঃসন্দেহে এটা এক ভ্রান্ত চিন্তা৷ ইবাদাতে বরং সহজ পন্থাটা অবলম্বন করে নেয়াটা সুন্নাত৷ নবিজীকে যখন ইবাদাতের দুটি পন্থার মাঝে ইচ্ছাধিকার দেয়া হতো তিনি সহজতর পন্থাটি গ্রহণ করে নিতেন৷

৭৬

কোনো নির্দিষ্ট আমল করে উঠবার নাম দীন নয়, কোনো নির্দিষ্ট জজবার নাম দীন নয়, দীন নয় কোনো নির্ধারিত ওজিফা পূরণ করে উঠবার নাম৷ দীন তো বরং আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা পূরণের নাম৷ যেটা তাঁর পছন্দ, যে পদ্ধতি তাঁর কাছে প্রিয়, যখন যেভাবে আমলের নির্দেশ তাঁর তখন সেই পদ্ধতির অনুসরণের নামই দীন৷ নামাজে দাঁড়াবার সমর্থ নেই, তো নিশ্চিন্তে বসে আদায় করুন৷ বসবারও শক্তি নেই, তো দ্বিধাহীন শুয়ে পড়ুন৷ প্রয়োজনে নামাজ আদায় করুন ইশারায়৷ আর জানুন—এটাই দীন৷ এটাই মহান রবের নির্দেশিত পন্থা৷

৭৭

রোগের ঘোরে ‘আহ’ ধ্বনি বের হয়ে আসতে চাইছে আপনার ভেতর থেকে৷ তবু আপনি জোর করে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বের করে আনছেন৷ এটা আল্লাহ তায়ালার ওপর বাহাদুরি৷ আল্লাহ তায়ালার সামনে বাহাদুরি দেখাতে যাবেন না৷

৭৮

রোগে-শোকে বান্দার জবান থেকে আল্লাহ তায়ালা ‘আহ’ শুনতে চান৷ আল্লাহ চান যেন বান্দা সকাতর তাঁর কাছে দুর্বলতা প্রকাশ করে এবং মিনতি করে দ্রুত আরোগ্য লাভের৷ এ সময় তিনি বান্দার থেকে জবরদস্তি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ শুনতে চান না৷

৭৯

অসুস্থতায় পড়ে বান্দা যখন কপাল ঠেকাতে পারে না মাটিতে, দিনভর রোজা রাখতে পারে না রোগের জন্যে আর সেই অপারগতার ব্যাথায় ব্যাথাহত হয়ে পড়ে হৃদয় আল্লাহর কাছে তা বড় প্রিয় হয়ে ধরা দেয়৷ মহান রব বড্ড পছন্দ করেন এমন ব্যাথাতুর হৃদয়৷

৮০

মহান রবের কাছে একজন মানুষের সর্বোচ্চ মর্যাদা—আবদিয়্যাত; গোলামী৷ রবের গোলাম হয়ে উঠুন৷ আর গোলাম রবের ইচ্ছা পূরণেই ব্যাপৃত থাকে কেবল৷ মুনিবের সমুখে তার নিজস্ব ইচ্ছা বলে কিছু থাকে না৷

৮১

অনেক সময় আমরা দৈনন্দিন নফল আমলের তালিকা করে রাখি: অমুক সময়ে এত পারা তিলাওয়াত করবো, দিনের অমুক মুহূর্তটাতে এত রাকাত নফল নামাজ পড়বো, এই সময়টাতে ব্যস্ত থাকব রবের জিকিরে৷ এটা খুবই ভালো৷ মুমিনের থেকে এমন পরিপাটি জীবন কাম্য৷ তবে প্রকৃত মুমিন হবার জন্যে সময়ের চাহিদাও বুঝতে হবে৷ অকস্মাৎ কেউ রোগাক্রান্ত হয়ে পড়লো, কেউবা অতীব প্রয়োজনে আমার সান্নিধ্য কামনা করে বসলো তখন দীনের চাহিদা হলো ওই রোগাক্রান্তের শুশ্রুষাতে ব্যাপৃত হওয়া৷ ওই প্রয়োজনগ্রস্তের পাশে দাড়ানো৷ তখনও যদি আমরা চিন্তা করি—অমুকের বিপদ সংকুল পরিস্থিতে তার পাশে দাঁড়াতে গেলে আমার দৈনন্দিনকার অজিফা ছুটে যাবে, আমার রুটিনবদ্ধ আমল এলোমেলো হয়ে যাবে—তবে এটা কেবল আমাদের দির্বুদ্ধিতাই হবে না; বরং ডেকে আনবে আল্লাহ তায়ালার নারাজি৷

৮২

আমার পরম শ্রদ্ধেয় উস্তাদ, মাওলানা মাসীহুল্লাহ খান সাহেব-আল্লাহ তালা তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করে দিন-প্রায়ই এক বিস্ময়কর কথা বলতেন৷ যা আজকের দুনিয়াতে আমাদের অনেকেরই পছন্দ নাও বা হতে পারে৷ তিনি বলতেন—আজ আমরা আলেম ও হতে আসি নিজের কামনাকে পূর্ণ করবার জন্যে৷ সেখানে অনুপস্থিত থাকে দীনের চাহিদা৷ কারুর মা অসুখে পড়ে আছে, বাড়িতে দ্বিতীয় কেউ নেই তার শুশ্রুষা করবার৷ কিন্তু সে মাকে ফেলে চলে এসেছে আলেম হতে৷ অথচ এখানে দীনের চাহিদা ছিল যে, ছেলে বাড়িতে বসে রোগাক্রান্ত মায়ের সেবা করে যাবে৷

৮৩

ভালো করে শুনে রাখুন—নিজের কামনা-বাসনা চরিতার্থ করবার নাম দীন নয়৷ সে কামনা বাহ্যত যতই কল্যাণকর মনে হোক না কেন!

৮৪

তদ্রুপ দেখা যায় তাবলিগের ক্ষেত্রে৷ নিঃসন্দেহে দীনের প্রচার মহৎ কাজ৷ তাবলিগ খুবই প্রয়োজনীয় ও উত্তম আমল৷ তাই বলে রুগ্ন স্ত্রীকে ঘরে ফেলে? ক্ষুধার্ত দুধের শিশুকে অসহায় রেখে? এটা দীন নয়৷ এটা কেবল নিজস্ব অভিলাষ৷ দীন এটার নাম নয়৷

৮৫

আজ চারপাশে কেবল শখ পূরণের ছড়াছড়ি দেখে উঠি৷ কারও মৌলভি হবার শখ, তো কারও শখ মুফতি হবার৷ কারও শখ জিহাদের ময়দানে লড়াই করবার কারওবা শখ আবার দাওয়াতের মেহনাতে জান কুরবান করে দেবার৷ কেউ দীনের চাহিদা খুঁজে দেখে না৷ এই মুহূর্তে, বর্তমান পরিস্থিতে তার ওপর কী হুকুম, দীন তার থেকে কী চায়—এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না৷ সবাই ব্যস্ত কেবল অভিলাষ পূরণে৷

৮৬

এইখানেই প্রয়োজন হয় একজন খোদাপ্রেমি রাহবারের; একজন দীনদার আলেমের৷ যে সঠিক দীনের প্রতি দিক নির্দেশনা দিবে৷ যে ব্যক্তির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তাকে বলে দিবে তার বর্তমান করণীয়৷ দীনের সঠিক ধারণা রাখে এমন রাহবার ছাড়া দীনের চাহিদা মতো আমল করা দুঃসাধ্যই বটে!

৮৭

অনেক জিকিরকারীকে আজানের সময়ও জিকিরে রত দেখা যায়৷ জিকির বন্ধ করে ধ্যানের সাথে আজান শোনাকে তারা সময়ের অপচয় ভাবে৷ তাদের এই ভ্রান্তির ওপর করুণা হয় আমার৷ আজানের সময় মুমিন যে সে ধ্যানের সাথে মুয়াজ্জিনের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ শুনবে এবং তার জবাব দিবে পরম মমতায়৷

৮৮

সমাজে বিদাআতের প্রচলনও হয় ইবাদাতের নামে এই অভিলাষ পূরণ করতে যাবার মাধ্যমে৷

৮৯

সর্বাবস্থায় আল্লাহ তালার শুকরিয়া আদায়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠুন৷ উঠতে বসতে মহান রবের প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপনে অভ্যস্ত যে বান্দা শয়তানের যাবতীয় কুমন্ত্রণা থেকে সে নিরাপদ থাকে৷

৯০

প্রতি রাতে ঘুমোবার কালে চোখ বুজে একবার স্মরণ করুন—দিনভর মহান রবের কোন কোন নেয়ামাত আপনি প্রাপ্ত হয়েছেন৷ তারপর শুকরিয়া আদায় করুন রবের সমীপে সেই তাবৎ নেয়ামাতের বিনিময়ে৷ দেখবেন—জীবন হয়ে উঠবে আরও স্বাচ্ছন্দ্যময়৷ আরও সুন্দর৷ আরও অধিক প্রাণবন্ত৷

৯১

শ্রুত সংবাদের যাচাই বাছাই ও বিশ্লেষণ মুমিন ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য৷ কোনো সংবাদ শোনা মাত্রই বিশ্বাস করে নেয়া মুমিন সুলভ আচরণ নয়৷

৯২

পৃথিবীতে কেউ গত হয়নি—যার কোনো অপূরণীয় আকাঙ্খা নেই৷ আশা পূরণ হলো না—এমন আক্ষেপ নিয়েই বরং বিগত হয়েছে অধিকাংশ মানুষ৷ পার্থিব কামনা-বাসনার ফিরিস্তি তাই সংক্ষেপ হওয়া কাম্য৷ কামনার ফিরিস্তি যার যতো সংক্ষিপ্ত পৃথিবীতে সে ততো সুখী৷ অল্পেতুষ্টিই সুখের প্রধান উপাদান৷

৯৩

দুনিয়ার প্রতি লোভ এবং দুনিয়াদারের প্রতি ঈর্ষা নিন্দনীয়৷ বিপরীতে সৎকর্মের তামান্না এবং সৎকর্মশীলের ইবাদাতের আধিক্যে ঈর্ষা রবের নিকট পছন্দনীয়৷

৯৪

অধিক ইবাদাতের তামান্না হৃদয়ে জাগ্রত হবার পর আল্লাহ তায়ালার তা বাস্তবায়নের তাওফীক চাইতে হবে৷

৯৫

নৈরাশ্য এসে ঘিরে ধরে আমাদের মাঝে মধ্যে—এত পরিশ্রমসাধ্য আমল আমার মতো নগন্য মানুষের দ্বারা পালন করা কি হয়ে উঠবে! আমি মুর্খ মানুষ; এত জটিল আমল কিভাবে সম্পন্ন হতে পারে আমা কর্তৃক! কিন্তু দিল যে মানে না! মন তো অমন আমল করতে চায়৷ দিলের তামান্না—আমিও অমনভাবে ডুবে থাকবো স্রষ্টার বন্দনায়৷ তখন, নিরাশা ঝেড়ে হৃদয়ে সঞ্চয় করে উঠতে হবে সাহস৷ আর কায়মনোবাক্যে আমলের তাওফীক চাইতে রাব্বে কারীমের কাছে৷ কারুর পক্ষে সম্ভব নয় তাঁর ইচ্ছা ছাড়া সামান্যও বন্দেগী করবার৷

৯৬

সৎকর্মের আগ্রহ একটি নেয়ামাত; আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহ৷

৯৭

পৃথিবীতে কে আছে এমন—দুর্দশা স্পর্শ করেনি কখনও যাকে! যে কোনোদিন বিপদ-মুসিবতে পড়েনি এমন আছে কি কেউ? কেউ নেই৷ পৃথিবী দুঃখ-সুখের সমন্বয়ে সৃষ্ট৷ আনন্দ এসে যেমন উদ্বেল করে তোলে আমাদের মন তেমন তাকে ভারাক্রান্তও করে তোলে দুঃখ৷ দুঃখ-সুখ দুটিই অনিবার্য৷ চিরসুখী কিংবা চিরদুঃখী নেই কেউ পৃথিবীতে৷ কিন্তু নিজের বিশ্বাসকে যদি গড়ে তোলা যায় তাকদীরের ছাঁচে ঢেলে; যদি মন প্রস্তুত হয় স্বীকার করে নিতে—যা আছে আমার নসীবে তা অব্যর্থ৷ তার মুখোমুখি হতেই হবে আমাকে৷ তবে সেই অসহনীয় দুঃখও হৃদয়কে আর ব্যাথাতুর করে তুলতে পারে না৷ বাহ্যত পাহাড়সম দুর্দশাও তখন হয়ে পড়ে তুচ্ছ ধুলিকণা সম৷ সামান্য এক ফুঁ এর তোড়ে উড়ে যায় তা ভাসমান বাতাসের সাথে৷

৯৮

ইশ্, যদি ওই চিকিৎসকের কাছে না যেতাম; যদি বাবাকে নিয়ে যেতাম অমুক চিকিৎসকের কাছে তবে বাবা আমার আরও কিছুকাল বেঁচে থাকতেন আমাদের মাঝে৷ যদি স্বর্ণের হারটা এখানে না রাখতাম তবে সেটা হারাতে হতো না এভাবে—আমাদের এমন উচ্চারণ আমাদের দুঃখকেই কেবল উস্কে দিতে থাকে৷ হৃদয়ের উপশম দেয় না তা কোনোভাবে৷ বরং দুর্বলতা তৈরি করে ঈমানের মাঝে৷ নড়বড়ে করে দেয় বিশ্বাসের ভিত৷ তাকদীরের ওপর সমর্পণই এমতাবস্থায় এনে দিতে পারে আমাদের হৃদয়ের প্রশান্তি৷ আত্মার স্থিতি৷

৯৯

বিপদ আপদ আল্লাহ তালার পক্ষ থেকেই আসে৷ অভিযোগ করলে সেটা তাই আল্লাহ তালার দিকেই আপতিত হয়৷ বান্দার এমন দুঃসাহসী হয়ে ওঠা অনুচিত৷ সে বরং ধৈর্য ধারণ করবে এবং প্রার্থনা করবে বিপদ মুসিবত যেন শীঘ্রই দূর করে দেন মহান রব৷ অভিযোগ করা কোনো ক্রমেই কাম্য নয়৷

১০০

আল্লাহ তায়ালার প্রিয়তম বান্দাদের ওপরই বিপদাপদ অধিক আপতিত হয়৷ ইতিহাস তো এমনই বলে৷

১০১

বান্দা যখন কোনো দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়, বাহ্যত যার উপযুক্ত নিজেকে সে মনে করে না আর সে ধৈর্য ধারণ করে৷ এবং সেই আরোপিত আপদের প্রতি আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোনো অভিযোগও দায়ের করে না আল্লাহ তখন সেই বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান৷

১০২

ঘটনা-দুর্ঘটনা জীবনে যা আপতিত হবার তা তো হবেই৷ সবই যে আল্লাহর তরফ থেকে হয়! তবে তার জন্যে হা পিত্যেশ করে, রবের দিকে অভিযোগ-মামলা মোকাদ্দামার আঙুল উঁচিয়ে লাভ কী! তারচে’ বরং ধৈর্যের পথ অবলম্বন করাই আমাদের জন্যে শ্রেয়৷ আপদ তো সময় হলে কেটে যাবেই৷ কিন্তু মনের ভেতর রবের প্রতি বিরাগ জন্ম দিয়ে নিজের যে ক্ষতি আমি করে চলেছি তা থেকে পরিত্রাণ মিলবে কিসে!

১০৩

আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট যে প্রাণ তারচে’ অধিক সুখী কেউ নেই আর৷

১০৪

তাকদীরে বিশ্বাস—এক বিস্ময়কর আকিদা৷ ঈমানের পূর্ণতা নির্ভর করে যার ওপর৷ আবার এই আকিদা সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা না রাখার ফলে নানান প্রকার গোমরাহিতে ডুবে যায় মানুষ৷ কেউ আছে এমন—তাকদীরে আস্থার নামে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকে৷ কোনো প্রকার কর্ম সাধনে ও উপার্জনের আয়োজনে সে রাজি নয়৷ তার বিশ্বাস খুবই দৃঢ়—আল্লাহ আমার রিজিকের এন্তেজাম করবেনই৷ বস্তুত এটা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা নয়৷ বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের দীক্ষা হলো—যে বস্তু হাসিলের যে পন্থা তা অবলম্বন করো৷ বৈধ পন্থা অবলম্বনে কোনো প্রকার খামতি রাখা চলবে না৷

১০৫

প্রকৃত মুমিন সে সম্ভাব্য সকল পন্থা অবলম্বন করে৷ পার্থক্য এতটুকু—তার ভরসা ওই গৃহীত পন্থার ওপর থাকে না; থাকে মহান রবের ইচ্ছের ওপর৷ রবের ইচ্ছে ও নির্দেশেরই অংশ তার পন্থাসমূহের অবলম্বন৷

১০৬

আপতিত আপদে চোখের পানি ফেলা রবের সিদ্ধান্তে সন্তোষের সাথে সাংঘর্ষিক নয়৷ কেননা তাঁর সিদ্ধান্তে সন্তোষ দ্বারা উদ্দেশ্য—আকলি অর্থাৎ বিবেক দিয়ে মানুষ এটা বিবেচনা করবে যে, আল্লাহর সিদ্ধান্তই সঠিক৷ কান্না তো বিপদের আঘাতে সৃষ্ট৷ চিন্তা স্বচ্ছ রেখে কান্না মহান প্রভূর কাছে নিন্দনীয় নয়; বরং পছন্দের৷

১০৭

বিষফোঁড়ার চিকিৎসার জন্যে আপনি জনৈক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন৷ তিনি আপনার বিষফোঁড়া যেই কাটতে গেলেন অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠলেন আপনি৷ গলার সবটুকু জোর ব্যয় করে ‘আহ’ চিৎকার করে উঠলেন৷ চোখ দিয়ে গড়িয়েও গেল বিন্দু বিন্দু অশ্রু-ফোঁটা৷ আপনি কাঁদছেন৷ আবার এই বিশ্বাসও ভেতরে পোষণ করছেন—চিকিৎসক যা করছেন আপনার মঙ্গলের জন্যই করছেন৷ রবের প্রতি আস্থা ও তাকদীরে বিশ্বাস রেখে কান্না করা ঠিক এমনই৷

১০৮

পার্থিব জীবনের সাফল্য যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দান; তেমনি ব্যর্থতাগুলোও তাঁরই দেয়া৷

১০৯

আমার যত অপূর্ণতা, যতো অতৃপ্তি তিনি আমারই কল্যাণার্থে রেখেছেন—এমনই হবে মুমিন হৃদয়ের বিশ্বাস৷

১১০

ঈমানের কালিমা উচ্চারণের সাথে সাথে তাকদিরের প্রতি আমাদের বিশ্বাস স্থাপিত হয়ে যায়৷ তবে সমস্যা যেটা রয়ে যায় কারুর বেলায়—তাকদিরের প্রতি সে বিশ্বাস কেবল মৌখিক উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে৷ জীবনের প্রতিটি স্তরে তা সমুখে উপস্থিত থাকে না৷ আর তাকদীরের প্রতি বিশ্বাস সমুখে অনুপস্থিতির থেকেই আমাদের যাবতীয় মনোযাতনার সূত্রপাত৷ আমরা দুখী হই, অপার যাতনায় কাতর হই তাকদীরের প্রতি পরিপূর্ণ ও পরিচ্ছন্ন আস্থার অভাবে৷

 

ইসলাম অওর হামারে জিন্দেগী, প্রথম খণ্ড থেকে নির্বাচিত

Login
guest
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments
www.ahmadsabbir.com | Developed by Shabaka IT
No Result
View All Result
  • চিন্তালাপ
  • চিত্তশুদ্ধি
  • অতীত কথন
  • ব্যক্তিপুস্তক
  • গল্পপত্র
  • স্মৃতিমেঘ
  • ভাবচিত্র
  • বই কেন্দ্রিক
  • দিন যাপন
  • কবিতা ভবন
  • আমার বই

www.ahmadsabbir.com | Developed by Shabaka IT

wpDiscuz