আমার এক বন্ধু প্রায় জোরপূর্বক আমাকে একদিন নিয়ে গেলো তার জনৈক বন্ধুর সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য৷
বন্ধুটি তার পরিপাটি ছিলো বেশ৷ স্যুটেট ব্যুটেট একদম আদ্যোপান্ত কর্পোরেট পুতুল৷ আমি বেশ অবাক হলাম—যা বয়স আমাদের দুজনের তার প্রায় দ্বিগুণ বয়সী তিনি৷ আমার বন্ধুর সেই বন্ধুটি৷ আমাকে নিয়ে বসানো হলো বহুতল ভবনের ছোট্ট একটি এসি রুমে৷ আমি বুঝতে পারছিলাম না, এমনকি আলাপচারিতার অনেকটা সময় পেরিয়ে যাবার পরও, কেন আমাকে এখানে নিয়ে এলো আমার বন্ধু৷ আমি তখন পুরোপুরি শিক্ষানুরাগী একজন শিক্ষার্থী৷ কোনো চাকরিপ্রার্থী হলেও বুঝতাম যে আমাকে কোনো কর্মের সন্ধান দিতে তার এই উদ্যোগ৷ কিন্তু তা তো হবার নয়৷
কিন্তু আরও অবাক হলাম যখন সেই মানুষটি আমাকে চাকরির মতোই কোনো একটা কর্মের অফার করলেন৷ তবে এটা ঠিক চাকরিও নয়৷ ভদ্রলোক নানাভাবে বোঝাতে থাকেন আমাকে—পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু একটা নিয়ে কর্মমুখর থাকা উচিত৷ তাতে করে আব্বা আম্মার ওপর কিছু চাপ কমে৷
তার উচ্চারিত শেষের বাক্যটি আমাকে আকর্ষণ করলো খুব৷ এই বাক্যটিই আমাকে হেঁচকা টানে টেনে নিলো ভদ্রলোকের দিকে৷ অতঃপর পরবর্তী আলাপ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে যেতে থাকি আমি৷
আমি ভাবি—সত্যিই, আব্বু একলা একা মানুষ কতো করেন আমার জন্য৷ একটা কিছু করে যদি তার বোঝা হালকা করা যায় মন্দ তো কিছু দেখি না৷ কেমন বিহ্বল হয়ে পড়ি আমি।
কিন্তু কাজটা কি আমার! তাও সেটা এমন কাজ যাতে আমার পড়াশোনার কোনো ক্ষতি হবে না! আমি বাপু পড়াশোনার ক্ষতি মেনে নিয়ে কিছু করতে রাজি নই৷
দীর্ঘ আলাপ চালিয়ে নিলেন ভদ্রলোক৷ যার কিছু শুনেছিলাম কিছু শুনে উঠতে পারিনি৷ কিছু বুঝেছিলাম আর কিছু বুঝে নিতে পারিনি৷
অধীর আগ্রহে যখন তৃষ্ণার মতো ভেতরে জেগে উঠেছে কর্মের স্পৃহা ভদ্রলোক ঠিক তখন খোলাসা করলেন আমার কাজের ফিরিস্তি৷ কাজটি খুব কঠিন কিছু নয়৷ অল্প কিছু টাকা দিয়ে তাদের কোম্পানির একটা প্রোডাক্ট কিনতে হবে৷ বিনিময়ে তারা আমাকে একটা সদস্য কোড দিবে৷ এরপরই মূলত আমার কাজ৷ আমার বন্ধু যেভাবে আমাকে আজ এখানে এনে হাজির করেছে তেমনি আমার পরিচিত কাউকে এনে একটি পণ্য কেনাতে হবে৷ তার পণ্য কেনার ফলে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট যুক্ত হবে আমার ‘একাউন্টে’৷ এভাবে ‘হাত’ যতো বাড়বে আমার ব্যালেন্স তত ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকবে৷
ভদ্রলোকের কথায় আমি প্রভাবিত হয়েই পড়েছিলাম৷ পণ্য একটা কিনে কাজে যুক্ত হয়ে পড়বো বলেও টাকা পয়সার জোগাড় শুরু করেও দিয়েছিলাম৷ আর তখনই কানে এলো ওই সংবাদ—ভুয়া ও প্রতারক এম এল এম কোম্পানি বন্ধ করে দিচ্ছে সরকার৷ যে কোম্পানীর আমন্ত্রণে আমি সাড়া দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম বড় প্রতারক হিসাবে তারাই দেখলাম চিহ্নিত হয়েছে৷
সেদিন সেই প্রতারকদের ফেঁসে যাওয়া দেখে আনন্দিত হয়েছিলাম না বহু মানুষের প্রতারণার সংবাদে ব্যাথিত হয়েছিলাম তা আর এতদিন পর ঠিকঠাক বলতে পারবো না৷
তবে বন্ধু হিসাবে এক এম এল এম কোম্পানির সন্ধান আপনাদের দিতে পারি৷ যাতে প্রতারিত হবার চান্স জিরো৷ এবং এই কোম্পানিতে যুক্ত হবার জন্য কোনো পণ্য কেনাও জরুরী নয়৷ দুই সাইড থেকেও সদস্য জুড়তে হবে না আপনাকে৷ যেভাবে পারেন কেবল ‘কোম্পানিতে’ লোক জুড়ে যাবেন৷ আপনার কাজের বেনিফিট তো আপনি পাবেনই আপনার একাউন্টে এসে জমা হবে তার কর্মের ফলাফলেরও একটা অংশ৷ আবার আশ্চর্যের যা—আপনাকে দেবার জন্য তার একাউন্ট থেকেও কিছু কমানো হবে না৷
অবাক হচ্ছেন, তাই না!
তাহলে চলুন এবারে একটু খুলেই বলি৷ এই এম এল এম কোম্পানির নাম হলো দাওয়াত৷ আমার বন্ধুটি যেভাবে আমাকে তার কোম্পানিতে আহ্বান জানিয়েছিলো তেমনি আপনি আহ্বান জানান আপনার বন্ধুকে ইসলামের সৌন্দর্যের দিকে৷ কোম্পানির সেই ভদ্রলোক যেভাবে ধৈর্য নিয়ে, অনেক সময় আমার জন্য ব্যয় করে কোম্পানির লাভ বয়ান করছিলো আমাকে, তেমনি আপনি আপনার বন্ধুকে সুন্দর ও দরদমেশানো ভাষায় বোঝাতে থাকেন ইসলামের বিধান ও তার ফলাফল সম্বন্ধে৷
আপনি দেখেছেন কিনা জানিনা৷ আমি দেখেছি—এমএলএম কোম্পানির ছেলেরা কতোটা পরিশ্রম করতো, কতবার ঘুরতো একজন মানুষের পেছনে৷ আঠার মতো লেগে থাকতে দেখেছি অনেককে৷ কেন! কেন তারা এমন করতো! কারণ একজনের কাছে কোম্পানির ‘দাওয়াত’ পৌঁছে দিতে পারলে, একজনকে কোম্পানির সাথে যুক্ত করতে পারলে এবং তার মাধ্যমে লোকটি যুক্ত হলে তারই লাভ৷ সেই লোকের কাছে যেই পণ্যটি বিক্রি করতে পারবে তার একটা অংশ সে পাবে৷ এরপর দ্বিতীয় মানুষটি যখন কোনো পণ্য বিক্রি করবে তার একটা অংশও সে পাবে৷
এই লাভটুকুর জন্য, স্রেফ সামান্য কয়টা পয়সার জন্য তারা একজন কাস্টমারের পেছনে আঠার মতো লেগে থাকতো৷
পাঠক! আপনাকে বলি! একজন সামান্য কয়টা অর্থের জন্য যদি এভাবে কারুর পেছনে লেগে থাকতে পারে তাহলে দীনের দাওয়াতের জন্য আমি আর আপনি কী পথভোলা বান্দার পেছনে লেগে থাকতে পারবো না!
তাদের ফলাফল তো শুন্য৷ যারা এম এল এম কোম্পানির জন্য এত কষ্ট করেছে তারা তো দিনশেষে প্রতারণা ছাড়া কিছুই পায়নি৷ কিন্তু আমি যদি একজনকে মসজিদমুখী করতে পারি, আমি যদি একজনকে দীনমুখী করতে পারি আমাকে রিক্তহস্ত হতে হবে না৷ আমার হাত ধরে যে দীনে ফিরে আসবে, আমার কথা শুনে যে ব্যক্তি ইসলাম পালন করতে আরম্ভ করবে জীবনভর তার সমস্ত নেকির একটা অংশ আমি পেতে থাকবো৷ এবং এতে করে তার নেকি থেকেও বিন্দুমাত্র কমানো হবে না৷
আমার কথা অবিশ্বাস্য মনে হলে নবিজীর জবানীতেই শোনেন৷ তিনি বলছেন,
যদি কোনো ব্যক্তি কাউকে হেদায়েতের দিকে আহ্বান করে আর সে যদি তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নেক আমল করে তবে যে ব্যক্তি আহ্বান করেছিলো সে আমলকারীর প্রতিদানের মতো প্রতিদান লাভ করবে৷ তবে আমলকারীর প্রতিদান থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না৷ [1]মুসলিম
দেখলেন তো! নবিজী বলছেন৷ পাছে আমলকারী যদি ভেবে বসে যে আমার প্রতিদান তাকে দিলে আমার কী থাকলো৷ তাই নবিজী সব খুলে বলে দিয়েছেন৷
পৃথিবীর আর কোন কোম্পানি আছে যে এমনভাবে দুইজনকেই সমানে সমানে প্রতিদান দেবে!
তবু আমরা দায়ী হই না৷ তবু আমরা কল্যাণের দিকে আহ্বাণকারী হই না৷ তবু আমরা নেকি অর্জনের সহজ পথটা অবলম্বন করি না!
একটু চিন্তা করুন তো—আপনি দুই রাকাত সালাত আদায় করলেন৷ ধরা যাক তাতে আপনাকে প্রতিদান দেয়া হলো একশ নেকি৷ কিন্তু নামাজের আগে যদি আপনার কলিগ কিংবা বন্ধুকেও বুঝিয়ে শুনিয়ে নামাজের মুসল্লায় হাজির করতে পারেন তাহলে! তাহলে, সে যে দুই রাকাত পড়বে তার একশ নেকিও যুক্ত হবে আপনার আমল নামায়৷ আর যদি পাঁচজনকে নিতে পারেন! যদি দশজনকে নিতে পারেন! যদি বিশজনকে নিতে পারেন! সুবহানাল্লাহ! নেকির অংক বাড়তেই থাকবে৷ আর মনে রাখবেন—আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রতিদানের কোনো কমতি হবে না৷ তাঁর ভাণ্ডার অফুরন্ত৷
তোমরা একে অপরকে সাহায্য করো কল্যাণকর কাজে৷ গোনাহ ও অপরাধে একে অন্যের সাহায্যকারী হইও না৷ [2]সূরা মায়িদা

মাশাল্লাহ ❣️
আমিও ঠিক একি প্রতারণা পড়তে যাচ্ছিলাম।
হঠাৎ এক বন্ধু মিষ্টি খাওয়াতে নিয়ে যায় এক অফিসে। আর সেখানেই হয় বিশাল এক বক্তব্য। আমার সাথে থাকা বন্ধুটা এই ফাঁদে পা দেয়। বিনিময়ে তার ১ হাজার টাকা উধাও।
https://shorturl.fm/wBwhK