একজন মুসলমানের কাছে ইসলামের প্রথম দাবী—সে আল্লাহতে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী হবে৷ তাঁর সাথে সম্পর্ক রক্ষার ক্ষেত্রে সে হবে অকৃত্রিম৷ তার হৃদয়ে সদা জাগ্রত থাকবে তাঁর স্মরণ৷ বিপদে আপদে ভরসার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকবেন তিনি৷ একজন মুসলিম সে পার্থিব বহু মাধ্যম অবলম্বন করবে, সফলতার জন্যে ব্যয়িত করবে তার সর্বোচ্চ সাধনা; তবে, প্রকৃত সাহায্যকারী হিসাবে জানবে মহান আল্লাহকে৷ সর্বক্ষেত্রে মহান রবের প্রতি আমি মুখাপেক্ষী—সে কখনও এই অনুভূতি-শূন্য হবে না৷
একজন প্রকৃত মুসলিম সে তার হৃদয়কে রাখবে জাগ্রত৷ অন্তর্দৃষ্টি রাখবে খোলা৷ গভীর চিন্তার সাথে ভাবিত হবে মহান রবের সৃষ্টি নৈপুণ্য সম্বন্ধে৷ অগাধ বিশ্বাসে বিশ্বাসী হবে যে, এই নিখিল বিশ্বের ওপর রয়েছে অদৃশ্য কারও নিয়ন্ত্রণ৷ যার ইশারায় সম্পন্ন হচ্ছে সকল আয়োজন৷ সে চারপাশের তাবৎ চাকচিক্যে মহান রবের কুদরত প্রত্যক্ষ করে উঠবে৷ জানবে যে, সকল দৃশ্যের চিত্রায়ণ ঘটে মহান প্রভূর ইশারায়৷ এভাবেই তার ঈমানে আসবে অবিচলতা৷ তার বিশ্বাসে তৈরি হবে দৃঢ়তা৷ সে অভ্যস্ত হবে মহান প্রভূর সার্বক্ষণিক স্মরণে৷ তার যাপিত জীবনের ভরসার কেন্দ্রস্থল হবে কেবল এক আল্লাহ৷
নিশ্চয় আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে বোধ সম্পন্ন লোকেদের জন্যে। যাঁরা দাঁড়িয়ে, বসে, ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং চিন্তা গবেষণা করে আসমান ও জমিন সৃষ্টির বিষয়ে৷ (তারা বলে) পরওয়ারদেগার! এসব তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সকল পবিত্রতা তোমারই, আমাদিগকে তুমি দোযখের শাস্তি থেকে বাঁচাও।
একজন সত্যিকার মুসলিম তার রবের আদেশের সামনে হবে অবনত৷ তাঁর প্রতিটি হুকুম পালনে সচেষ্ট হবে বিনম্র বিনয়ের সাথে৷ সে কখনও অতিক্রম করবে না তার রবের বেঁধে দেয়া সীমানা৷ সর্বাগ্রে রাখবে রবের ইচ্ছাকে; যদিও মন তাতে সায় না দেয়৷ কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করবে রবের প্রেরিত ফরমান অনুযায়ী; যদিও তার নিজস্ব ইচ্ছা তার থেকে ভিন্ন হয়৷ আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের ইচ্ছার সামনে তার নিজের ইচ্ছাকে সে অবদমিত করে রাখবে৷ নিজের কামনাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিবে না সে আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের ইচ্ছার সমুখে৷
তোমাদের কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তার কামনাকে সে আল্লাহর বিধানের অনুগামী করবে৷
অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোন রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।
আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের প্রতি নিঃসংকোচ আনুগত্য এবং প্রতিটি কথা-কাজে তাঁদের অনুসরণ ছাড়া নিজেকে মুসলিম দাবী করা অবান্তর৷ সেই ইসলামের কানা কড়ি মূল্য নেই মহান আল্লাহর কাছে৷ আর এই আনুগত্য কেবল নিজের জীবনে গ্রহণই যথেষ্ট নয়৷ তার কর্তৃত্বের প্রতিটি স্তরে, তার নিয়ন্ত্রনাধীন প্রতিজন মানুষের জীবনে বাস্তবায়িত করতে হবে৷ মুসলিম হিসাবে এটাও তার আবশ্যক কর্তব্য৷
তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল৷ আর অবশ্যই প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হবে৷
নিজ কর্তৃত্বাধীন কারও মাঝে মহান রব ও তাঁর রাসুলের প্রতি আনুগত্যহীনতা যাকে বিচলিত করে না, বিব্রত করে না—তার ঈমান পরিপূর্ণ নয়৷ সে এখনও সত্যিকারের মুসলিম হয়ে উঠতে পারিনি৷
একজন প্রকৃত মুসলিম যে সে তার রবের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিবে৷ তার ওপর আপতিত প্রতিটি আপদও৷ তার সমুখে থাকবে রাসুলের এই বাণী—
মুসলমানের ব্যাপারটি খুবই আশ্চর্যজনক৷ তার প্রতিটি কাজেই কেবল প্রভূত কল্যাণ৷ যদি আনন্দ তাকে স্পর্শ করে সে কৃতজ্ঞ হয়৷ ফলে সে লাভ করে কল্যাণ৷ আবার আক্রান্ত হয় যদি সে কোনো বিপদে তখন ধৈর্য ধরে৷ এর বিনিময়েও সে লাভ করে কল্যাণ৷
কারণ, একজন সত্যিকার মুমিন বিশ্বাস করে—রবের সিদ্ধান্তে সন্তোষ জ্ঞাপন ঈমানের অপরিহার্য অংশ৷ সব কিছু রবের পক্ষ থেকেই হয়, আনন্দ-দুঃখ, বিপদ-আপদ, সব৷ এটা মেনে নিয়ে, হৃদয়ে এই ধারণা বদ্ধমূল রেখে সে যখন আনন্দে কৃতজ্ঞ হবে আর বিপদে হবে না প্রভূর প্রতি অকৃতজ্ঞ, হারাবে না ধৈর্য-স্থৈর্য তখন সে লাভ করবে প্রতিদান৷ এই প্রতিদান ‘ভালো-মন্দ সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়’—এই ধারণার পুরস্কার৷
তবে এও অমোঘ সত্য—মুমিন মন কখনও কখনও অবচেতন হয়ে পড়ে৷ তখন স্খলন ঘটে যায় তার৷ জড়িয়ে পড়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ভ্রান্তিতে৷ রবের সাথে যে সম্পর্ক রাখে কিংবা রাখতে চায় সে এই অবচেতন থেকে শীঘ্রই ফিরে আসবে৷ উঠে দাঁড়াবে সে স্খলন থেকে৷ আর তার উঠে দাঁড়াবার অবলম্বন হবে তাওবা৷ এস্তেগফার৷ অযাচিত ভুল চুকের জন্য ঐকান্তিক অনুশোচনা৷
যাদের মনে ভয় রয়েছে, তাদের উপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে উঠে।
মানুষ ভুলে পড়েই যেতে পারে৷ প্রকাশ হতে পারে তার থেকে কোনো অশোভন কাজ৷ কিন্তু সে সতর্ক হতে দেরি করবে না৷ প্রভূর সাথে দ্রুতই সে নিজের সম্পর্কের বোঝাপড়া করে নিবে৷ রবের সাথে তার সম্পর্ক হবে তাওবা এবং অনুশোচনার৷ জিদ কিংবা হঠকারিতার নয়৷
একজন আদর্শ মুমিনের সাথে তার রবের সম্পর্ক হবে বন্ধুতার; কেবলই গোলাম-মুনিবের নয়।
