একজন কবি প্রকৃত কবি হয়ে ওঠে মৃত্যুর পর
খালেদের সাথে আমার দেখা হয়ে যাওয়াটা একটি আকস্মিক ঘটনা ছিলো৷
দিনটি ছিলো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের চল্লিশ বছর পূর্তি-দিবস৷ ঢাকা শহরে এসেছি অনেকদিন৷ সাহিত্যের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে বিসাক, বাতিঘর, পাঠক সমাবেশ ইত্যকার যায়গাগুলোর নাম প্রায়শই শুনে উঠতাম৷ যাওয়ার ইচ্ছাটাও দিনদিন তীব্রতর হতে থাকে৷ একজন পাঠক এবং বইপ্রেমী হিসাবে এ ইচ্ছাটা কিছু অমূলক নয়৷ কিন্তু সময় সুযোগের পর্যাপ্ততার অভাবে যাওয়া হয়ে ওঠেনি কোনোদিন৷ সেদিন কেন যেন হঠাৎ ইচ্ছে হলো বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র দেখে আসি৷ সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকে বিসাকের সাথে আমার সম্পর্ক৷ অনেক বছর তাদের ভ্রাম্যমান লাইব্রেরির সদস্য আমি৷ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতি একটা আকর্ষণ তাই বাল্যকাল থেকেই৷
আগে যাইনি কোনোদিন; জানিও না— কীভাবে যেতে হয় বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে৷ কেবল জানি— বাংলামোটর বলে একটা যায়গা আছে সেখানেই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র৷ কিছু নিজস্ব অনুমানে আর কিছু লোকেদের সহায়তায় বেলা এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম বিসাকের গলিমুখে৷ পৌঁছে দেখি— সে এক এলাহী কাণ্ড৷ লোকে লোকারণ্য সামান্য গলিপথ৷ আমি তখনও বুঝিনি— এক বিশেষ দিনের বিশেষ মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছি আমি বিসাকের সমুখে৷ কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম প্রথমটাতে৷ কিংকর্তব্যবিমূঢ় দাড়িয়ে রইলাম৷ কর্তব্য স্থীর করে উঠতে পারছিলাম না— ফিরে যাবো নাকি এসেছি যখন দেখেই যাই!
আমার এই দ্বিধাগ্রস্ততা থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন সাইদ ভাই৷ সাইদ ভাই আমারই সহপাঠী ছিলেন৷ মাদরাসাতে একই ক্লাসের ছিলাম আমরা৷ একে অন্যের মুখচেনা হলেও আলাপ হয়নি কোনোদিন৷ সাইদ ভাই সামনে এসে বিস্ফারিত নয়নে বলে উঠলেন— আরে সাব্বির ভাই! আপনি এখানে? আপনিও বিসাকে আসেন নাকি?
তার মুখেই প্রথম শুনতে পেলাম ‘বিসাক’৷ পরে বুঝে নিই বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রকেই তারা আরাম করে বিসাক সম্বোধন করে৷
আমি সলজ্জ উত্তর করি— না না, আজই প্রথম এলাম৷
সাইদ ভাই হাত ধরে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন৷ ভিড় ঠেলে পরিচিত ভঙ্গিতে তার এগোনো দেখে বুঝে নিই— এখানে তার নিত্য গতায়াত৷ সাইদ ভাই হাত ধরে আমাকে বিসাকের রিসিপশন রুমে এনে বসিয়ে দেন৷ সেইখানেই পরিচয় হয় আমার খালেদের সাথে৷
সোনালি কাপড়ের ওপর সোনালি রঙেরই ডোরাকাটা ডিজাইনের পাঞ্জাবী ছিলো সেদিন খালেদের পরনে৷ খুবই হাস্যোজ্জ্বল এবং স্বতস্ফূর্ত দেখি তাকে৷ তার পাশে নিজেকে বড়ো বিবর্ণ আবিস্কার করি৷ তা বুঝি খালেদের চোখ এড়ায় না৷ সে তার স্বভাব-হাসি মুখে ধরে আমার পাশে এসে বসে৷ পরিচিত হই আমরা৷ আমার নাম ‘আহমাদ সাব্বির’ শুনে লক্ষ্য করি সে একটু নড়ে ওঠে৷ বিস্ময়তাড়িত চোখে উচ্চারণ করে— আপনিই আহমাদ সাব্বির৷ আপনার গল্প তো আমি নবধ্বনিতে পড়েছি!
আমি অবাক হই খালিদের কথা শুনে৷ ভাবি— আমারও তবে পাঠক আছে৷ পরমুহূর্তেই খালেদের সাথে আমার অন্তরঙ্গতা জমে ওঠে৷ তা খালেদ আমার গল্পের পাঠক সেজন্য নয়; খালেদের সেই ক্ষমতা ছিলো৷ পরবর্তীতেও দেখেছি— মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নেবার এক দুর্লভ গুণ রয়েছে তার৷ সেই জোরেই সে আমাকে আপন করে নিলো৷ তার আন্তরিকতায় আমি বেমালুম ভুলেই গেলাম যে আমি কোন নতুন যায়গাতে আছি৷ বসে আছি শতেক অচেনা মানুষের ভিড়ে৷
খালেদ আমাকে নিয়ে উঠে এলো সাত তলায়৷ আমি জানতামই না বাতিঘর বিসাকেরই ভবনে৷ সে আমাকে বাতিঘর সম্পূর্ণটা ঘুরিয়ে দেখালো৷ আমি এক বিন্দু মিথ্যা বলছি না৷ খালেদ সেদিন বাতিঘরে আমাকে এমনভাবে সঙ্গ দিয়েছিলো দূর থেকে দেখে কারও অনুমানও করবার উপায় ছিলো না যে আজই আমাদের প্রথম পরিচয়৷ যেনবা শহরে আগত আপন বড় ভাইকে শহর দেখাতে বেরিয়েছে৷ এতোটা অন্তরঙ্গতা ছিলো তার পদক্ষেপে৷ বিকাল পর্যন্ত ছিলাম আমরা সেদিন একসাথে৷ প্রথমদিন তেমন কোনো কথা হয়নি আমাদের; হয়নি কোন স্বপ্নের আদান-প্রদান৷ তবে বন্ধুত্বের শক্ত এক ভিত জমে যায় সেদিন৷ যে ভিতটি মজবুত ছিলো তার মৃত্যু সংবাদ শোনার মুহূর্তটির পরও; যা সেভাবেই মজবুত আছে তার চলে যাওয়ার এই এতদিন পরও এবং এমনই অটুট থাকবে চিরদিন— আমার বিশ্বাস৷
একদিন মধ্যরাতে আমার ফোন কেঁপে ওঠে৷ রিসিভ করতেই ও প্রান্তে কথা বলে ওঠে খালেদ৷ আমাকে প্রস্তাব করে— চলেন, সূর্যস্নানে যাই৷
কক্সবাজার যাওয়া হয়নি কোনোদিন৷ আগ্রহ তৈরী হয় তাই খালেদের প্রস্তাবে৷ রাজি হতে গিয়েও নিজের বর্তমান সমস্যাবলীর উপস্থিতিতে কক্সবাজার যাত্রায় তার সঙ্গি হতে সাহস করে উঠতে পারি না৷ আমি তাকে বোঝাতে প্রয়াসী হই৷ খুলে বলি ইচ্ছার কথা এবং ইচ্ছার বাস্তবায়নে যাবতীয় অন্তরায়ের কথা৷ খালেদ সহাস্যে প্রতিবাদ করে ওঠে৷ এবং আমাকে তীব্র ভর্ৎসনা করে এই সামান্য সমস্যাকে না যাওয়ার জন্য অজুহাত করেছি বলে৷ অবশেষে সে আমার তাবৎ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নিলে আমি তার সফরসঙ্গী হতে রাজী হয়ে যাই এবং পরদিন সন্ধ্যায় কক্সবাজারগামী গাড়িতে দু’জন চড়ে বসি৷
কক্সবাজারে আমি উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত এক খালেদকে দেখে উঠি৷ কত যে কথা, কত যে স্বপ্ন সে তার করোটিতে বয়ে বেড়াতো তা জেনে অবাক হই৷ হোটেল হানিমুনের আবদ্ধ কক্ষে খালেদ তার লেখার খাতা আমার সমুখে মেলে ধরে৷ দুটো গল্প লিখেছে সে৷ আমাকে পড়ে শোনায়৷ মন্তব্য দাবী করলে আমি আমার সাধ্যমতো তার লেখায় কিছুটা কাটাচেরা করি৷ বেশ বিনয়ী দেখি তখন খালেদকে৷ গল্প নিয়ে সেদিন আমাদের আরও আলাপ হয়৷ গল্পের ভেতর গল্প থাকা জরুরী কিনা, গল্পের ভাষা নিয়ে আজকাল যে নিরীক্ষা দেখে উঠি চারপাশে সেই নিরীক্ষা নিয়েও আমাদের আলাপ হয় কিছু৷ স্টোরি টেইলার হিসাবে খালেদের পক্ষপাত ছিল শাহাদুজ্জামানের প্রতি৷ খালেদ বলতো এবং তার সে বক্তব্যে আমার দ্বীমত ছিল না— শাহাদুজ্জামানের গল্পে নিরীক্ষা আছে তবে ভাষাটাও দেখেন কেমন ভিন্ন৷ অন্য অনেকের মতো ম্যাড়মেড়ে নয়৷ আবার গল্প ছাড়া কেবলই ভাষার কচকচানি শাহাদুজ্জামানের গল্পে নেই৷
এই প্রসঙ্গে শাহাদুজ্জামানে বিখ্যাত গল্প ‘এক কাঁঠাল পাতা আর মাটির ঢেলার গল্প’ এর কথা তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে সে জোর দিয়ে বলে— এর মধ্যেও কিন্তু আপনি ‘জবরদস্ত’ একটা স্টোরি পাবেন৷
খালেদের আরেকটা স্বপ্নের যায়গা ছিলো— সিনেমা৷ আরও বিস্তৃত করে বললে— ভিজ্যুয়াল৷ খালেদ বুঝে ফেলেছিলো— সামনের দিনগুলো ভিজ্যুয়ালের রাজত্বকাল৷ শর্টফিল্ম নিয়ে তার ভাবনা ছিল যথেষ্ট পরিপক্ক৷ নানান ফেস্টিভ্যালে যেতো৷ বিসাকের সিনেমা বিষয়ক ক্লাসগুলোতেও শরীক থাকতো নিয়মিত৷ সিনেমা বিষয়ক নানান বই পত্র জোগাড় করা খালেদের নেশার মতো হয়ে গিয়েছিলো৷
প্রায়ই বলতো— ‘মার্কস ইন সোহো’ হবে তার প্রথম কাজ৷ আমরা বন্ধুরা তাকে বলতাম— মার্কসিজম ইজ ফিনিসড৷ এটাকে তো আর হাইলাইট করার কিছু নাই৷
সে সরল স্বীকারোক্তি পেশ করতো— একটা মানুষ মানুষের মুক্তির জন্য এত বড় একটা থিউরি রেখে গেল দুনিয়ার সামনে, তাকে তো পরিচয় করিয়ে দেবার দরকার বর্তমান প্রজন্মের কাছে৷ সময়ে সময়ে এই নিয়ে আমাদের জমজমাট তর্ক বেঁধে যেতো৷ কিন্তু হাওয়ার্ড জিনের নাটক ‘মার্কস ইন সোহো’ নিয়ে শর্ট ফিল্ম বানানোর ভূত তার কাঁধ থেকে নামানো যেতো না৷
এক সন্ধারাতে খালেদের সাথে হাঁটছিলাম বাংলামোটর থেকে শাহবাগগামী রাস্তায়৷ অকস্মাৎ খালেদ বলে ওঠে— সাব্বির ভাই, একটা গল্প দেন আমাকে৷
আমি ভাবলাম— পত্রিকার জন্য চাইছে হয়তবা৷ সে সময় তার মাথায় লিটল ম্যাগের ভূত সওয়ার৷
সে বলে— না, ম্যাগের জন্য না৷ শর্টফিল্ম বানাবো৷ গল্প দেন৷
তার কথায় কিছুক্ষণ ‘থ’ মেরে যাই৷ বলে কী ছেলে?
তাকে বলি— আমি তো অতবড় গল্পকার নই৷
সে যেন ছাই দিয়ে চেপে ধরে৷ অবশেষে রাজী হই৷ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই— একটা ভালো গল্প লিখে উঠতে পারলে দিব তাকে শর্টফিল্মের জন্য৷
গল্প তো লিখছি৷ ‘ভালো’ গল্পও হয়তবা লিখে উঠবো একদিন৷ কিন্তু খালেদ কী আর ফিরে আসবে সেই গল্পের চিত্রায়নের জন্য!
আসবে না৷ যে চলে যায় আর ফেরে না৷ তবু বোকার দল এই আমরা কখনও কখনও চেয়ে থাকি তার চলে যাওয়া পথের দিকে৷ এই ভ্রম নিয়ে— যদি সে ফিরে আসে!
খালেদের জন্য এমন চেয়ে থাকার কাল চলছে আমার৷
