রাস্তাটা পার্কের একেবারেই শেষ প্রান্তে৷ সঙ্গত কারণেই পথচারীর আনাগোনা এদিকটাতে তুলনামূলক কম৷ ফলে নিরবতার ভয়াবহ একটা আবহ বিরাজমান এখানে; সারাক্ষণ৷
স্কুল ফাঁকি দিয়ে আসা; বুক তো একটু দুরু দুরু করবেই৷ তবে ক্লাবে আজ জম্পেশ আড্ডা হবে— সে খুশিতেই কিনা হৃদস্পন্দন অতোটা কানে পশছে না৷ পলাশ, শাওন, সুজন ওরা হয়তো এতক্ষণে পৌঁছে গেছে৷ আজও আমার দেরি হয়ে গেল৷ খামাখা কৈফিয়ত দিতে হবে৷ ক্লাবের এই রুলটার সাথে আমি একদমই একমত নই৷ আরে বাবা! স্কুলে এলাম নাকি যে সামান্য দেরি হলেই কৈফিয়ত দিতে হবে! ভয় নয়ন ফাজিলটাকে নিয়ে৷ ফাইন করে বসতে পারে৷ এইতো সেদিনের ঘটনা— রুমেলের পৌঁছুতে দেরি হলো মিনিট দশেক৷ নয়ন বলে বসে— সবাইকে ‘স্টিক’ খাওয়াতে হবে৷ (নয়ন আবার আহ্লাদ করে সিগারেটকে বলে স্টিক৷ সিগারেট বলতে নাকি তার লজ্জা করে৷ যত্তসব ঢং!) মিনিট প্রতি একটি করে৷ ওর কি! ও তো ভাবে স্কুল ফাঁকি দেয়া পৃথিবীর সহজতম একটি কাজ৷ ওর তো আর বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আসতে হয় না! তাই ঠিক বোঝে না, কতোটা ঝুকি নিয়ে ফের স্কুল পালাতে হয়!
হাঁটার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিই৷ জরিমানার পরিমাণ কিঞ্চিত কমানোর প্রয়াস আর কি!
এক দিকে নিষিদ্ধ কাজ করে উঠতে পারার আনন্দ অন্য দিকে ভয়ানক শঙ্কা— না জানি আব্বু আবার সব কিছু জেনে যায়! আব্বু জেনে ফেললে আমার যে কী দশা হবে— ভাবতেই গা শিউরে ওঠে!
এমনই দোদুল্যমানতার ভেতর এগোচ্ছি৷ হঠাৎই কেউ একজন আমার পথ আগলে দাড়ায়৷ জরাজীর্ণ শরীর৷ মুখাবয়বে অসহায়ত্বের ছাপ স্পষ্ট৷ শরীরে লেপ্টে থাকা মলিন পোশাকই বলে দিচ্ছে তার দীনতা৷ হাত দুটি আমার দিকে উঁচিয়ে ধরে৷ মুখে যদিও কিছু বলে না, তবু তার দুর্বল চাউনির ভাষা বুঝে ওঠা কঠিন হয় না৷ কিছু পর অস্ফুট কি যেন বলছে শুনলাম৷ ভালো করে কান পাততেই যা শুনি তা মনে পড়লে আজও, এই এতদিন পরও অনুশোচনার আগুণে ঝলসে উঠি৷ বড় বেশি অপরাধী মনে হয় নিজেকে৷ ওর সেদিনের বলা ক্ষীণকায় সেই বাক্যটি আজও যেন আমি শুনতে পাই৷ আজও মনে হয় তার সেই নিরপরাধ অবাক চাউনি আমরা মৃতপ্রায় বোধকে খুচিয়ে খুচিয়ে জাগিয়ে যায়: ‘কয়দিন থাইক্যা কিছু খাই না, দুইডা ট্যাহা দিবেন ভাইজান! এট্টা রুডি খামু’
আশ্চর্য! সে আমার থেকে মাত্র হাত দুয়েক দুরে৷ অথচ মনে হলো যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা দুর্বল কণ্ঠস্বর কোনো৷ অজান্তেই আমার হাত প্যান্টের পকেটে চলে যায়৷ পকেটের এক কোণে পাঁচ টাকার একটি দুমড়ানো নোট পড়ে ছিল৷ বাসে না চড়ে সিগারেট কেনার জন্য যা সযতনে বাঁচিয়ে রেখেছি৷
বেশিদিন হয়নি সিগারেট ধরেছি৷ তবে সুখের কথা হলো— বন্ধুদের পরম আন্তরিকতায় (!) এ কদিনেই নেশা আমার তুঙ্গে৷ সারাদিন পেটে দানাপানি না পড়ুক আপত্তি নেই এক রত্তি৷ কিন্তু ‘ধুমায়িত শলাকা’তে সুখটান না দিলে পৃথিবীটা যেন মৃত্যুপুরী বনে যায়! চারপাশ ছেয়ে যায় কেমন গুমোট অন্ধকারে৷
রাজ্যের আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে ছেলেটা আমার দিকে৷ চোখ দুটো স্থির রেখেছে কেমন আমার চোখের ওপর৷ তবে প্রসারিত হাত দুটো গুটিয়ে নিয়েছে অল্পক্ষণ৷ চোখের ঔজ্জ্বল্য দেখে বুঝে নিই— সে ধরেই নিয়েছে তার প্রতি দয়ার্দ্র হয়ে উঠেছে আমার হৃদয়৷
আমি এক লহমায় ঝটকা টানে আমার চোখ নামিয়ে নিলাম তার চোখ থেকে৷ মাটিতে কিছু খোঁজার অভিনয় করে হাঁটতে শুরু করলাম তাকে অতিক্রম করে৷ তাকে পেছনে রেখে ছুটে চলি অনিশ্চিত গন্তব্যপানে৷ নিদারুণ তৃষ্ণা আমার মাথায় চেপে বসেছে৷ তার তৃষিত চোখের পানে দ্বিতীয়বার দেখব— সাহস হলো না৷ পাছে ওর ক্ষুধাতুর ফ্যালফ্যাল চাউনির কাছে যদি হেরে যাই!
