বীজতলায় আপনি যে ফসলের বীজ বপন করবেন সেখানে সেই ফসলেরই চারাগাছ রোপিত হবে৷ ধান ছড়ালে ধান আর গম ছড়ালে গম৷ আপনি বীজতলা ভরিয়ে তোলেন যদি কোনো বিষবৃক্ষের বীজ দিয়ে তবে বীজতলায় গজিয়ে উঠবে সেই বিষাক্ত বীজেরই গুচ্ছ গুচ্ছ চারা গাছ৷
আপনার মনের যে জমিনটা আছে তাকে কল্পনা করতে পারেন, তা যেন একখানা বীজতলা৷ লাঙল চালিয়ে, পানি ছিটিয়ে তা নরোম করে তোলা হয়েছে৷ এখন তাতে যে বীজ ফেলে দিবেন সেখানে বেড়ে উঠবে তারই চারাগাছ৷ আর ক্রমেই সেই চারাগাছ হয়ে উঠবে বিশাল মহিরুহ৷
ফসলী জমিতে যেভাবে বীজ ছড়ানোর আগে চিন্তা ভাবনা করতে হয় আপনাকে, যেভাবে নানাদিক সম্বন্ধে ভেবে নেন তদ্রুপ মনের জমিনেও বীজ ছড়াবার কালে আপনাকে ভাবনা চিন্তা করে নিতে হবে৷
আমাদের বাহ্যিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যা বাস্তবায়িত করে তা যেন মনের জমিনে বোপিত বীজ থেকে অঙ্কুরিত চারা গাছ৷ আপনি যে কাজটা হাত দিয়ে করেন, যে কথাটা মুখে বলে প্রকাশ করেন প্রথমে তা তো আপনার মাথায় হাজির হয়, আপনার করোটির অন্দরে তার একটা ছায়া দেখতে পান৷ যাকে আমরা চিন্তা বা কর্মের ইচ্ছা বলতে পারি৷ প্রথমে আমাদের মনে কর্মের একটি ইচ্ছা তৈরি হয়৷ তারপর আমরা সেটা বাস্তবে প্রকাশ করি৷
আমাদের কল্পিত ইচ্ছাগুলো কখনও ভালো কাজের হয় কখনও আবার আমাদের ইচ্ছাগুলো হয়ে থাকে খুবই মন্দ৷ ইচ্ছা যদি ভালো হয় তবে যেন এটা একটা ভালো বীজ৷ মনের জমিনে এটাকে বাড়তে দেয়া উচিত৷ এবং সবশেষে অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন করাটাও কল্যাণকর৷
কিন্তু আমাদের ভেতরে যদি জন্ম নেয় খারাপ কাজের কামনা তবে এটাকে মনের বীজতলায় ছড়িয়ে দিতে নেই৷ এটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে হয় দূরে৷ শক্ত পাথুরে কোনো জমিনে৷ যেন তা থেকে অঙ্কুর গজাতে না পারে৷ যেন তা কর্মের আকৃতিতে আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সাহায্যে বাস্তবায়িত হতে না পারে৷
এজন্য আল্লাহ ওয়ালা মানুষেরা বলেছেন,
তোমার মনে উদিত হওয়া প্রতিটি চিন্তাকে যাচাই করো। [1]রিসালাতুল মুসতারশিদীন
ইমাম ইবনুল কায়্যূম রহিমাহুল্লাহ বলেছেন,
তোমার (মন্দ) চিন্তাকে প্রতিহত করো৷ যদি তা না পারো তবে তোমার চিন্তা কু প্রবৃত্তির রূপ ধারণ করবে৷ যদি মন্দ চিন্তা কু প্রবৃত্তির রূপ নেয় তখন তার বিরুদ্ধে লড়াই করো৷ যদি লড়াইয়ে টিকতে না পারো তবে তা কিন্তু আরও শক্তি পেয়ে দৃঢ় সংকল্পে পরিণত হয়ে যাবে৷ এখন তুমি যদি তোমার দৃঢ় সংকল্পকে আটকাতে না পারো তবে তা তোমার কর্মের মধ্য দিয়ে বাস্তবে রূপায়িত হবে৷ এরপর কর্মের মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন যদি ঠেকাতে না পারো তবে সেই মন্দ চিন্তা, যা কর্মে পরিণত হয়েছে, তাতে তুমি অভ্যস্ত হয়ে পড়বে৷ আর একবার মন্দ কাজে অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তা ছেড়ে দেয়া তোমার জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দেখা দেবে। [2]আল ফাওয়ায়েদ, পৃষ্ঠা: ৩১
জমিতে উৎপন্ন যে কোন আগাছাকে অঙ্কুরেই উপড়ে ফেলতে হয়৷ তাকে বাড়তে দিতে নেই৷ বাড়তে দিলে ফসলেরই ক্ষতি৷ তেমনি মনের মধ্যে কোনো বাজে চিন্তার ছবি ফুটে উঠলে তাকে স্থায়ী করতে নেই৷ দ্রুতই মুছে ফেলতে হয়৷ কোনো মান্দ কাজের চারাগাছ গজিয়ে উঠলে তার যত্ন নিতে নেই৷ বরং ছোটো থাকতেই, শেকড় আরও গভীরে যাবার আগেই তাকে উপড়ে ফেলে দিতে হয়৷
সাহাবায়ে কেরামের মনেও কখনও কখনও এমন বাজে চিন্তা জেগে উঠতো৷ কিন্তু তারা বাড়তে দিতেন না৷ সেটার গোড়ায় পানি ঢালতেন না৷ বরং নবিজীর সাথে আলোচনা করে দ্রুতই সেই চিন্তাকে টেনে ছুঁড়ে ফেলতেন মনের বাইরে৷ অনেক দূরে৷
বাজে চিন্তা আসাটা খারাপ নয়৷ শয়তান তো প্রতিনিয়ত আমাদের ওয়াসওয়াসা ও কুমন্ত্রণা দিতেই থাকে৷ কিন্তু চিন্তাটা বাস্তবে করে ওঠা হলো দোষের৷ মনের মধ্যে কখনও মন্দ চিন্তা চলে এলে আমার কর্তব্য হবে তাকে প্রশ্রয় না দেয়া৷ এবং মন্দ চিন্তাটাকে মন্দ হিসাবেই দেখা৷ সেটাই হবে আমার মুমিনসুলভ আচরণ৷
হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন,
একবার রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট তাঁর কতিপয় সাহাবী এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা আমাদের অন্তরে এমন কিছু অনুভব করি যা ব্যক্ত করাকে বা যা মুখে বলাকে আমরা গুরুতর মনে করি। আমরা এ ধরণের কথা মনে আসা অথবা পরস্পর সমালোচনা করাকে পছন্দ করি না। তিনি বললেন, তোমরা কি এরূপ অনুভব করো? (অর্থাৎ, মন্দ চিন্তা মনে চলে আসাটাকে গুরুতর মনে করো কিনা!) তারা বললেন, হ্যাঁ৷ তখন নবিজী বললেন, এটা স্পষ্ট ঈমানের লক্ষণ। [3]সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৫১১১
এ হাদীস থেকে আমরা দিক নির্দেশনা খুঁজে পাই৷ মনে কখনও মন্দ চিন্তা চলে আসলে আমাদের করণীয় কী হবে তা আমরা জেনে উঠি এই হাদীস থেকেই৷ আমাদের কর্তব্য হবে চিন্তাটাকে মন্দ হিসাবেই বিবেচনা করা৷ এবং তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে মন থেকে ঝেড়ে ফেলা৷ মন্দ চিন্তা জাগ্রত হওয়াটাকে নবিজী বড় করে দেখছেন না৷ যদি তাকে মন্দ বিবেচনা করা হয় সেটাকে বরং তিনি ঈমান থাকার আলামত হিসাবে ব্যক্ত করছেন৷
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর থেকে আরেকটি বর্ণনা আছে৷ মনে জাগ্রত ইচ্ছা সম্বন্ধে যেখানে আমরা আরও স্পষ্ট নির্দেশনা পাই৷ তিনি বলছেন যে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
আল্লাহ আমার উম্মতের হৃদয়ে যে খেয়াল জাগ্রত হয় তা ক্ষমা করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কার্যে পরিণত করে বা মুখে উচ্চারণ করে। [4]সহিহ বুখারী, হাদিস: ৫২৬৯
মনে চিন্তা ভাবনা আসতেই পারে৷ তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে সেটা যেন আমাদের কথা কিংবা কাজে বাস্তবায়িত না হয়৷
আল্লাহ তায়ালার কাছে তাওফিক কামনা করছি৷
