এক,
ইসলাম আগমনের প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করে নিয়েছিলেন উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা। ইসলামের সত্যতা এবং অনিবার্যতা বুঝে নিতে সামান্য সময় ক্ষেপণ হয় না তার। এটা নিঃসন্দেহে উম্মু সালামার বুদ্ধিমত্তা বিচক্ষণতা এবং তাঁর অসীম সাহসিকতার পরিচায়ক। কারণ তিনি যেই সময়ে ইসলাম কবুল করেছেন তখন, সেই সময়কার অবস্থা যে মোটেও মুসলমানদের অনুকূলে ছিল না, প্রত্যহ তাদের মোকাবিলা করতে হচ্ছিল সমূহ বিপদের—সেটা তাঁর অজানা ছিল না। তবু সত্য গ্রহণে যে তিনি পিছু পা হননি এবং কাল বিলম্ব করেননি বাহ্যত সেই অগ্নি-মাল্য বরণ করে নিতে—এটাই প্রমাণ করে সৎ সাহসিকতার সাথে তিনি আপোষ করবার মানুষ ছিলেন না।
ইসলাম সত্য। রাসুল সত্য। সত্য তাঁর আনীত মহান দীন। সুতরাং তা কবুলে এবং তার বিস্তারে ভয় কিসের—এমনই ছিল উম্মু সালামার মানসিকতা। এবং বাস্তবিক অর্থেও সেই ইসলাম কবুলের পর থেকেই তার সাহস ও মানসিক শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়ে গেছেন তিনি আমৃত্যু। হাবশার প্রথম হিজরত, হাবশার দ্বীতিয় হিজরত, একলা একা মদীনার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া এবং শতেক বাধা বিপত্তি ডিঙিয়ে মদীনা অবধি পৌঁছা–এর সবই ছিল দীন ও সত্যের জন্য তার সাহসিকতার একেকটি দাস্তান।
এরপর যখন তিনি জড়িয়ে গেলেন নবী জীবনের সাথে, নিজেকে আসীন করলেন উম্মুল মুমিনীনের উচ্চকিত মর্যাদায় তার সাহসিকতা যেন অনন্য মাত্রা লাভ করলো। অধিকার প্রতিষ্ঠায়, নিজের প্রাপ্য আদায়ে কিংবা দীনের জ্ঞান অর্জনের জন্য জিজ্ঞাসা—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি তার সাহসিকতার সাক্ষর রেখে চলেন। ভয় কিংবা শঙ্কা দীনের নতুন কিছু জানবার ব্যাপারে তার সমুখে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারে না। দীনের আপাত জটিল কোনো সমস্যার সমাধানে রাসুলের মুখোমুখি হতে অযাচিত আড়ষ্টতা তাকে কখনও আটকে রাখতে পারে না। বিনয় আদব শিষ্টাচার ও সাহসিকতার বিরল মূর্তি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা।
এ ক্ষেত্রে আমরা সেই গল্পটি মনে করতে পারি। সাহাবায়ে কেরাম হাদিয়া তোহফা কেবল আয়িশার (রাদিয়ল্লাহু আনহা) ঘরেই পাঠাতেন। অন্যান্য উম্মুল মুমিনীনরা কিছুটা মনোযাতনার মুখোমুখি হন তাতে। সাহাবায়ে কেরাম কেন একজনকেই কেবল হাদিয়া দেবেন! তারাও তো রাসুলেরই সহধর্মিনী! তখন রাসুলকে এই বিষয়টি অবগত করাবার জন্য তারা প্রতিনিধি হিসাবে উম্মু সালামাকেই বেছে নেন। কারণ, আর কারুর বুকে অতোটা সাহস সঞ্চারিত ছিল না যে তিনি আয়িশার ব্যাপারে কথা বলতে রাসুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন।
উম্মু সালামার সাহসিকতার উপলব্ধিতে আমরা আরেকদিনের আরেকটি গল্প স্মরণে আনতে পারি। একবার নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের ওপর মনক্ষুণ্ন হন। এবং সকলের থেকে আলাদা হয়ে একাকী থাকতে শুরু করেন। প্রখ্যাত সাহাবি উমর ইবনুল খাত্তাবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কন্যা হাফসা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) ছিলেন নবিজীর বিবাহ বন্ধনে। হজরত উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নবি পরিবারের এই সমস্যার মীমাংসায় উদ্যোগী হয়ে নবিজীর বাড়িতে এলেন। কন্যা হাফসাকে খানিক ধমকাধমকির পর গেলেন উম্মু সালামার কাছে। তার কাছে গিয়ে এ বিষয়ে মুখ খুলতেই উম্মু সালামা তাকে বলে ওঠেন, কী আশ্চর্য হে খাত্তাব-পুত্র! সবখানে নাক গলাতে গলাতে এখন নবী পরিবারেও নাক গলাতে চলে এসেছেন! এমন কথার পর উমরের আর কী থাকে বলার মতোন! তিনি সেখানে থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ির পথ ধরেন৷ [1]বুখারী– ৪৯১৩
উম্মু সালামার চিন্তা ছিল—যা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ দাম্পত্য জীবনের সাথে সম্পর্কিত। স্বামী স্ত্রীর মান অভিমান। প্রতিটি পরিবারেরই এমন নিজস্ব কিছু অভিমানভরা গল্প থাকে। থাকে কিছু হাসি আনন্দ ও বেদনার কোলাহল। এগুলো একান্তই আন্তরিক ও স্বামী স্ত্রীর নিজস্ব। উমর কেন সেই একান্ত গল্পের অযাচিত চরিত্র হতে যাবেন! তিনি কেন অন্যের দাম্পত্যের মতো একদমই আন্তরিক বিষয়ে মতামত দিতে আসবেন! একান্ত পারিবারিক ব্যাপারে উমরের এমন অযাচিত প্রবেশ তিনি ভালোভাবে নিতে পারেন না। এবং পেছনে তার কাজের সমালোচনা না করে সামনেই বলে দেন। এমনই ছিলেন উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহা।
উম্মু সালামার অসীম সাহসিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত এখানে আমরা হাজির করতে পারি৷ সে রাসুলের ইন্তেকালের বহুকাল পরের ঘটনা৷ তখন হিজরী ছত্রিশ সাল৷ মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক বছর৷ এ বছরেই সংঘটিত হয় জঙ্গে জামাল বা উষ্ট্রীর যুদ্ধ৷ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ যুদ্ধে মুসলমানের রক্ত ঝরে তারই জ্ঞাতি-গোষ্ঠী মুসলমানের হাতে৷ আশারায়ে মুবাশ্বিরা হযরত তালহা ও হজরত জুবায়েরের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) মতোন বুজুর্গ সাহাবী শাহাদাত বরণ করেন এই নির্মম ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধেই৷ বসরার মাটি দশ হাজার মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত হয়৷ এই নির্মমতার পেছনের ক্রীড়নক হিসাবে কাজ করছিলো ইসলাম বিদ্বেষী স্বার্থান্বেষী এক মহল৷ আমিরুল মুমিনীন হজরত উসমানের মর্মান্তিক শাহাদাতের ঘটনাকে পুঁজি করে তারা ভাইয়ে ভাইয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সফল মঞ্চায়নে সমর্থ হয়৷ তারও বেশি দুঃখের যা ঘটে এই যুদ্ধে—ষড়যন্ত্রকারীদের অপচেষ্টায় ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়ে উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বিশ হাজার মুসলমানের এক বাহিনী নিয়ে বসরা অভিমুখে রওনা হয়ে যান৷ ঘটনার বাস্তবতা অবহিত করে উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়িশাকে কেউ ফেরাবে সে সাহস আর কার! পরিস্থিতি এমনই ঘোলাটে হয়ে যায় আয়িশার সামনে এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলবে সে হিম্মতই হয় না কারুর৷ তখন, উম্মাহর সেই দুঃখজনক সময়ে উম্মুল মুমিনীন উম্মু সালামা উদ্যোগী হন৷ প্রয়াসী হন নিজের উপলব্ধটুকু আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে অবগত করিয়ে তাকে তার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরাবার৷ আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রযত্নে লিখে ফেলেন তিনি তার সেই ঐতিহাসিক পত্রটি৷ সেই পত্রে উম্মু সালামার সাহসিকতার স্ফূরণ যেমন ছিল তেমন ছিলো আয়িশা ও সমস্ত উম্মাহর জন্য হৃদয় নিংড়ানো দরদ৷ ঐতিহাসিক সেই পত্রটির ভাষ্য ছিলো—
নবীপত্নী উম্মু সালামার পক্ষ থেকে উম্মুল মুমিনীন আয়েশার প্রতি৷
আমি আল্লাহর প্রশংসা করছি, যিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নাই৷
পরকথা এই যে, আপনি আল্লাহর রাসুল ও তাঁর উম্মতের মধ্যকার একটু সেতু ভেঙে দিয়েছেন৷ তা একটা সম্মানের পর্দা৷ আপনার আঁচল কুরআন সংরক্ষণ করেছে; বসরা-যাত্রার মাধ্যমে তাকে টেনে ছিন্ন করবেন না৷ আল্লাহ তায়ালা আপনার গৃহ ও অঙ্গনকে সুস্থির করেছেন৷ তাকে মরূভূমিতে পরিণত করবেন না৷ আপনারা কোথায় কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন! আল্লাহ তায়ালা আছেন এই উম্মতের সঙ্গে৷
রাসুল সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি জানতেন নারী জিহাদ করবে তাহলে সে দায়িত্ব আপনাকেই দিতেন৷ আপনি কি জানতেন না তিনি আপনাকে দ্বীনের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম করতে নিষেধ করেছেন? দীনের স্তম্ভ ঝুঁকে পড়লে তা নারীদের দ্বারা সোজা হবে না৷ তা ফেটে গেলে নারীদের দিয়ে তার নির্মাণ হবে না৷ নারীদের জিহাদ হলো—দৃষ্টি অবনত রাখা৷ আঁচল সংবরণ করা৷ আর ভালোবাসা মায়া মমতার প্রাসাদ নির্মাণ করা৷ আপনাকে যদি এই মরূভূমির কোনো এক কূপ থেকে আরেক কূপে সরে আসা কোনো জন্তুর মুখোমুখি হতে হয় তাহলে আপনি আল্লাহর রাসুলকে কী জবাব দেবেন? আগামিতে তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে দাড়াবেন৷ আমাকে যদি বলা হতো—হে উম্মু সালামা, জান্নাতে প্রবেশ করো৷ কসম করে বলছি, আমি আমার ওপর বিধৃত পর্দাকে লঙ্ঘন করে আল্লাহর রাসুলের সামনে দাড়াতে লজ্জা পেতাম৷ [2]আ‘লামুন নিসা–৫/২২৫
দুই,
তখন হিজরী পঞ্চম সন। মাত্রই শেষ হয়েছে খন্দক যুদ্ধ। নবিজী জোহরের নামাজান্তে বিশ্রাম করছেন উম্মু সালামার ঘরে। এমন সময় জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে সালাম করলেন তাঁকে। আর সালামের পরই নবিজীকে শুনিয়ে দিলেন আল্লাহর ফরমান।
মদীনার উপকণ্ঠেই বসত করতো ইহুদী গোত্র বনু কুরায়জা। তাদের সাথে নবিজীর চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিলো এই মর্মে যে, তারা মদীনার মুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার শত্রুতা পোষণ করবে না। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে না। এবং কখনও মদীনা আক্রান্ত হলে মুসলমানদের তারা সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করবে। কিন্তু বনু কুরাইযা এই সব কটি চুক্তি ভঙ্গ করে। খন্দকের যুদ্ধে মক্কার কুরাইশেরা যখন মদীনা অবরোধ করে তারা তাদেরকে নানাভাবে সহায়তা করে। চুক্তির সবকটি ধারা অমান্য করে তারা অস্ত্র ধারণ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে। জিবরীল মারফত আল্লাহ ফরমান পাঠালেন নবিজীকে বনু কুরাইযার এই বিশ্বাসঘাতকতার সমুচিত শাস্তি দেবার জন্য। আল্লাহর আদেশ পেয়ে নবিজী সেদিনই আসরের সময় মদীনার পার্শ্ববর্তী বনু কুরাইজার এলাকা অবরোধ করে ফেললেন।
অবরোধের প্রায় পঁচিশ দিন পর তারা আত্মসমর্পনে বাধ্য হয়। তবে একটি আর্জি রাখে নবিজীর কাছে: তাদের অন্যতম মিত্র সাহাবী আবু লুবাবা ইবনু আবদিল মুনজিরের সাথে আলাপ করে তবেই তারা অস্ত্র সমর্পণ করবে। নবিজী তাদের এই মিনতি রাখলেন। এবং আবু লুবাবাকে পাঠালেন বনু কুরাইজার ইহুদিদের সাথে আলাপ করবার জন্য।
আবু লুবাবা ছিলেন নরোম মনের মানুষ। বনু কুরাইজার দুর্গে প্রবেশ করতেই ইহুদি নারী শিশুরা তার কাছে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। এমন অঝোর ধারার কান্না দেখে তার আবেগের নদী আরও প্রবল বেগে উথলে ওঠে। আবেগের বশবর্তী হয়ে তিনি নবিজীর গোপন পরিকল্পনার কথা তাদের কাছে ফাঁস করে দেন—আমার পরামর্শ তোমরা অস্ত্র সমর্পণ করো। তবে তোমরা অস্ত্র সমর্পণ করো কিংবা না করো তোমরা কেউই বাঁচতে পারবে না৷ তোমাদের সবাইকেই হত্যা করা হবে।
তীর ছুটে গেছে হাত থেকে। তাকে আর ফেরাবার উপায় নেই। কথাটা মুখ থেকে বেরোনোর পরই আবু লুবাবার উপলব্ধ হয়—মারাত্মক ভুল করে বসেছেন তিনি। নবিজীর একান্ত গোপন পরিকল্পনা ফাঁস করে দিয়েছেন শত্রুপক্ষের কাছে। নবিজী ও মুমিনদের সাথে বিরাট অন্যায় করে ফেললেন তিনি। নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে থাকেন আবু লুবাবা। লজ্জায় তিনি আর নবিজীর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারেন না। মদীনায় ফিরে মসজিদে নববীর একটি খুটির সাথে বেঁধে ফেলেন নিজেকে। প্রতিজ্ঞা করেন—যতক্ষণ না নবিজী তার অপরাধ মার্জনা করে নিজ হাতে খুলে দিচ্ছেন তার রশির বাঁধন ততক্ষণ এভাবেই নিজেকে সে বেঁধে রাখবে খুটির সাথে।
অভিযান শেষ। বিজিত হয়ে মদীনায় ফিরেছেন নবিজী। বনু কুরাইজা আত্মসমর্পণ করলে আল্লাহর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের পুরুষদের হত্যা করা হয় এবং বন্দি করা হয় নারী ও শিশুদের।
নবিজী জেনেছেন সব। আবু লুবাবা নিজেকে মসজিদে নববীর খুটির সাথে বেঁধে রেখেছেন—এ সংবাদ সম্পর্কেও তিনি অনবগত নন। কিন্তু রাসুল কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন ওহীর আগমনের। আসমান ওয়ালাই ফায়সালা করবেন আবু লুবাবার৷
একজন পূর্ণ বয়স্ক ও কর্তৃত্ববান পুরুষ নিজেকে বেঁধে রেখেছেন মসজিদের খুটির সাথে। নিজের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কেবল কৃত ভুলের মার্জনার জন্য শাস্তি দিচ্ছেন নিজেই নিজেকে। এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসের পাতায় আর কটি আছে আমাদের জানা নাই। নামাজ আর প্রাকৃতিক প্রয়োজনের সময় বাঁধন খুলে দেয়া হয়। প্রয়োজন শেষে আবার তিনি নিজেকে জড়িয়ে নেন রশির শক্ত বাঁধনে–এভাবেই পেরিয়ে যায় পাঁচটি দিন। ঘটনার ষষ্ঠ দিনের কথা। নবিজী রাত্রি যাপন করছেন উম্মু সালামার ঘরে। রাত্রি ফুরিয়ে ভোরের আলো যখন উদ্ভাসিত হতে চলেছে তখন নবিজীর কাছে এসে পৌঁছলো আল্লাহর ফরমান। কবুল করে নিয়েছেন তিনি আবু লুবাবার তাওবা। তার কৃত অপরাধ মাফ করে দিয়েছেন তিনি। আয়াত অবতীর্ণ হলো আবু লুবাবার ক্ষমা ঘোষণায় “আর কিছু মানুষ আছে এমন যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে। তারা মিশ্রিত করে ফেলেছে একটি নেককাজ এবং অন্য একটি বদকাজ। শীঘ্রই আল্লাহ হয়তো তাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।” [3]সুরা তাওবা– ১০২
প্রিয় সাহাবির ক্ষমা ঘোষণায় নবিজীর চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মিষ্টি হাসির দোলা ছড়িয়ে পরে তাঁর অবয়বজুড়ে। উম্মু সালামা কাছেই ছিলেন। নবিজীকে এভাবে অকস্মাৎ হেসে উঠতে দেখে তিনি কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ তায়ালা আপনার হাসিকে অম্লান রাখুক। কী কারণে হেসে উঠলেন, জানতে পারি কি!
নবিজী বললেন, আল্লাহ তায়ালা আবু লুবাবার তাওবা কবুল করে নিয়েছেন।
রাসুলের মুখে এ কথা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই হাসির বিচ্ছুরণে উম্মু সালামার মুখও আলোকিত হয়ে ওঠে। আবু লুবাবা কদিন ধরে নিজেকে যেভাবে শাস্তি দিচ্ছেন, অনুশোচনায় দগ্ধ হয়ে যেভাবে নিজেকে বেঁধে রেখেছেন মসজিদে নববীর খুটির সাথে—তা দেখে উম্মু সালামার মন ও ভার হয়ে উঠেছিল। তার এমন ক্ষমার ঘোষণা তাই উম্মু সালামাকেও উদ্বেলিত করে ভীষণভাবে। রাসুলকে জিজ্ঞেস করেন, তার তাওবা কবুলের সংবাদ কি আমি বাইরে গিয়ে সবাইকে বলতে পারি!
নবিজী মুচকি হেসে তাঁর প্রিয়তমার অভিপ্রায়ে সম্মতি প্রকাশ করেন, হুম, বলতে পারো।
উম্মু সালামা উঠে গিয়ে তাঁর হুজরার মুখে দাঁড়িয়ে আবু লুবাবাকে সম্বোধন করে বলেন, আবু লুবাবা! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহ তোমার তাওবা কবুল করে নিয়েছেন।[4]সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ– ৩/১৮৭ [5]মাওসুয়াতু উম্মাহাতুল মুমিনীন– ১৪৬–১৪৭
আরেকদিন। নবিজী একদিন বসে আছেন উম্মু সালামার ঘরে। হঠাৎই ওহী এলো, হে নবী পরিবারের সদস্য! আল্লাহ কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে। এবং তোমাদের পূর্ণরূপে পূতঃপবিত্র রাখতে। [6]আহযাব– ৩৩
আয়াতটি অবতীর্ণ হবার পরক্ষণেই নবিজী হাসান হুসাইনকে খবর দিয়ে আনালেন। আয়াতটি শুনিয়ে কন্যা ফাতিমা ও হাসান-হুসাইনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, এরাই হলো আমার আহলে বাইত। আল্লাহ তাদের ক্ষমা করুন এবং নিজ রহমত দ্বারা তাদেরকে ঢেকে নিন।
রাসুলের মুখে এমন দোয়া শুনে বিষণ্ন হয়ে পড়েন উম্মু সালামা। রাসুল বলেন, তোমার কী হলো! উম্মু সালামা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি কি আপনাদের সাথে নই! রাসুল মুচকি হেসে বলেন, তুমিও আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। [7]আল মু’জামুল কাবীর– ২৩/৩৫৭
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘরে থাকাবস্থায় নবিজীর কাছে বহুবার ওহি অবতীর্ণ হয়েছে। এটা নিয়ে হজরত আয়িশার গর্বের শেষ ছিল না। এবং এটা পরম গর্বেরই। কিন্তু আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার ধারণা ছিল এমন গৌরবে আল্লাহ তায়ালা কেবল তাকেই গৌরবান্বিত করেছেন। নবিজী আর কারও ঘরে থাকাবস্থায় আল্লাহ তায়ালা ওহি পাঠাননি। এটাকে আম্মাজান আয়িশা আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে নিজের বিশেষ এক প্রাপ্তি বলে ধারণা করতেন। যেই নেয়ামতে তিনি একাই বিষিষ্ট। এবং অন্যদের কাছে তাঁর এই বৈশিষ্ট্যের প্রকাশও করতেন বেশ তৃপ্তির সাথে।
একদিনের কথা। সখী পরিবেষ্টিত বসে আছেন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। রাসুলের অন্যান্য স্ত্রীরাও উপস্থিত আছেন সেখানে। আম্মাজান আয়িশা এই প্রসঙ্গটি আলোচনায় তুললেন। এবং দাবী করে বসলেন যে, এটা তার একার বৈশিষ্ট্য। আর কারুর ঘরে আল্লাহ তায়ালা ওহী পাঠাননি। উম্মু সালামা পাশে বসে আয়িশার এই কথা শুনছিলেন আর হাসছিলেন মুখ টিপে। তারপর আয়িশার বলা যখন শেষ হয় তখন তিনি আবু লুবাবার ক্ষমা ঘোষণা কেন্দ্রিক ঘটনাটি বলেন। এবং বলেন—ওহী তার ঘরেও অবতীর্ণ হয়েছে একাধিকবার। এবং আরও স্মরণ করিয়ে দেন—তাবুক যুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করা সেই তিনজন সাহাবীর কথা। তাদের ক্ষমা ঘোষণা সম্বলিত আয়াত যখন অবতীর্ণ হয় সে মুহুর্তেও নবিজী তার ঘরেই অবস্থান করছিলেন। সেদিন, উম্মু সালামার মুখে এ কথা শোনার পর আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় ওহি অবতীর্ণ হবার সাথে তিনি একাই বিশিষ্ট নন। উম্মু সালামারও অংশ আছে রবের এই বিশেষ নেয়ামতে। [8]মাওসুয়াতু উম্মাহাতুল মুমিনীন– ৩১৫
তিন,
উম্মু সালামার ঘরে ওহী অবতীর্ণ হয়েছে কেবল নয়; বরং তার কারণে, তার প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা এবং কৌতূহলের প্রক্ষিতেও ওহি এসেছে বহুবার। এবং বলা যায়—এই সম্মানটি এমনই বিরল যার সাথে কেবল উম্মু সালামা রাদিয়াল্লাহু আনহাই বিশিষ্ট। নবিজীর আর কোনো সঙ্গিনী এমন অসামান্য সৌভাগ্যে ভূষিত হবার অবকাশ পাননি। এ নেয়ামত একান্তই উম্মু সালামার। সেখানে আর কারুর অংশ নেই।
একবার নবিজীকে তিনি জিজ্ঞেস করে বসেন, হে আল্লাহর রাসুল! কুরআনে দেখি কেবল পুরুষদের কথাই বলা হয়েছে! নারীদের সম্বোধন করে সেখানে কেন কিছু বলা হয়নি! তার এই জিজ্ঞাসার পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তায়ালা সুরা আহযাবের পঁয়ত্রিশ নম্বর আয়াত নাযিল করেন। যেখানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও সম্বোধন করে তিনি বলেন “নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ-বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ-দানশীল নারী, রোজা পালনকারী পুরুষ রোজা-পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী পুরুষ-যৌনাঙ্গ হেফাজতকারী নারী, আল্লাহর অধিক জিকিরকারী পুরুষ-আল্লাহর অধিক জিকিরকারী নারী–তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহা পুরষ্কার।” [9]আহযাব– ৩৫ [10]মুসনাদে ইমাম আহমাদ– ৬/৩০১
আরেকবার। উম্মু সালামা নবিজীকে বলেন, পুরুষেরা জিহাদ করে। আমরা নারীরা জিহাদ করতেও পারি না। এদিকে আবার উত্তরাধিকার সম্পত্তির বেলায়ও নারীরা পেয়ে থাকে পুরুষের অর্ধেক, কারণ কী!
উম্মু সালামার এই কৌতূহলের উত্তরও স্বয়ং রাব্বে কারীম প্রদান করেন। আয়াত নাযিল করে তিনি জানিয়ে দেন, তোমরা এমন কোনো বিষয়ের আকাঙ্ক্ষা করো না, যে বিষয়ে আল্লাহ তোমাদের একজনের ওপর অন্যজনকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। [11]সুরা নিসা– ৩২
হিজরত প্রসঙ্গেও উম্মু সালামার এরকম একটি জিজ্ঞাসা ছিল। নবিজীকে তিনি বলে বসেন, হে আল্লাহর রাসুল! হিজরতের কষ্ট তো নারীরাও স্বীকার করেছে। কিন্তু কুরআনে নারীদের হিজরত প্রসঙ্গে তো কিছু বলতে শুনি না! তার কৌতূহলের প্রেক্ষিতে আয়াত অবতীর্ণ হয় “আমি তোমাদের কোনো পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না। সে পুরুষ হোক কিংবা নারী। তোমরা পরস্পরে এক।” [12]সুরা আল ইমরান– ১৯৫
চার,
নবিজীর কাছে ওহি নিয়ে আগমন করতেন আল্লাহর ফিরেশতা হজরত জিবরীল আমীন। জিবরীল আমিনের অনুপম সৌভাগ্য কি বলা যায় এটাকে–পৃথিবীর সূচনা লগ্ন থেকে সকল নবী রাসুল পয়গম্বর ও আল্লাহ তায়ালার মাঝে তিনি ভূমিকা পালন করতেন সংযোগ সেতু হিসাবে। সকল নবীর সাক্ষাৎ লাভে ধন্য হয়েছেন একমাত্র তিনিই কি! সন্দেহ নেই—আল্লাহ তায়ালার বার্তার বাহক যিনি তার মর্যাদা অনেক উর্ধ্ব।
নবিজীর কাছে জিবরীল অসংখ্যবার এসেছেন। কখনও নিজের আকৃতিতে কখনওবা অন্য কারুর রূপ ধরে। অন্যের রূপ ধরেই নবিজীর কাছে তিনি অধিক আগমন করতেন। কারণ তার নিজস্ব যে দেহ কাঠামো তা দেখে হুশ রাখতে পারা দুনিয়ার স্বাভাবিক মানুষের জন্য সাধ্যাতীত। নবিজী পর্যন্ত জিবরীলকে তার নিজস্ব আকৃতিতে প্রথমবার যখন দেখে ওঠেন সারা শরীরজুড়ে কাপুনি ধরে যায়।
জিবরীল আমিন অধিকাংশ সময়ই প্রখ্যাত সাহাবী দাহিয়্যা কালবির রূপ ধরে আসতেন। নবিজী তো এই আকৃতিতে জিবরীলকে দেখেছেনই; নবিজী ছাড়াও আরও ক’জন মানুষের সৌভাগ্য হয়েছে এই মহান ফিরেশতাকে দেখবার। এবং অবশ্যই তার প্রকৃত রূপে নয়। বরং দাহিয়্যা কালবির রূপে। আর নবিজীর সহধর্মিণীদের মধ্যে এই বিরল সম্মান কেবল উম্মু সালামারই। তিনিই দেখছেন জিবরীলকে দাহিয়্যা কালবির রূপ ধরে নবিজীর সাথে আলাপন করতে। [13]ফাতহুল বারি– ৯/৫
একদিন নবিজী বসে আছেন উম্মু সালামার ঘরে। সাহাবি দাহিয়্যা কালবি এসে প্রবেশ করেন সেখানে। দাহিয়্যাকে দেখে উম্মু সালামা আবডালে চলে যান। দীর্ঘক্ষণ কথা হয় হয় তার রাসুলের সাথে। দাহিয়্যা চলে গেলে নবিজী মুচকি হেস উম্মু সালামাকে জিজ্ঞেস করেন, বলো তো আগন্তুক কে ছিলো?
রাসুলের এমন ছেলে মানুষী দেখে উম্মু সালামা বেশ অবাক হন। বিস্ময় নিয়ে বলেন, বারে, সে তো দাহিয়্যা কালবি। তাকে না চেনার কী হলো!
নবিজী আর উম্মু সালামার বিস্ময় ভাঙেন না। ঠোঁটের মাথায় মুচকি হাসির আভা নিয়ে মসজিদে চলে যান। সেখানে সমবেত সাহাবাদের সামনে নবিজী বয়ান করেন। ‘আল্লাহ বলেছেন’ উল্লেখ করে সে সকল কথাই সাহাবাদের সামনে বলতে থাকেন যেসব কিছু সময় আগে দাহিয়্যাকে বলতে শুনেছেন উম্মু সালামা। তখন আর তার বুঝতে বাকী থাকে না–খানিক পূর্বে নিজের ঘরে যাকে দেখে উঠেছেন সে দাহিয়্যা কালবি নয়; তার রূপধারী আল্লাহর দূত জিবরীল আমিন। তার বিস্ময়ের জবাবে রাসুলের মুচকি হাসির রহস্যও আর অনুদ্ঘাটিত থাকে না উম্মু সালামার কাছে। [14]সহীহ বুখারী
পাঁচ,
একজন মুমিনের সব চাইতে বড় সম্পদ তার তাকওয়া। যাকে আমরা খোদাভীতি বলি। কারুর যদি খোদাভীতিই না থাকে তাকে প্রকৃত মুমিন বলি কোন উপায়ে! ঈমান তো তাকওয়া এবং আশার ওপরই নির্ভর করে। প্রকৃত মুমিন সেই যে আল্লাহ তায়ালার দয়া অনু্গ্রহ ক্ষমা এবং রহমাত প্রাপ্তির আশা হৃদয়ে লালন করবার পাশাপাশি তাকে ভয়ও করে নিখাঁদভাবে। আল্লাহর প্রতি ভয়ই একমাত্র এমন যা যথার্থরূপে একজন মানুষের ঈমান আমলের সংরক্ষণ করতে পারে। আল্লাহর প্রতি যার হৃদয়ে ভয় নেই, আল্লাহ আমাকে সর্বক্ষণ দেখছেন, আমার প্রতিটি আমলের হিসাব তিনি রাখছেন, আমার প্রতিটি কাজের জবাবদিহিতা করতে হবে একদিন তাঁর কাছে–এই অনুভূতি যার হৃদয়ে সদা জাগরূক থাকে না সে প্রকৃত মুমিন হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করে উঠবে কোন উপায়ে! তাকওয়া ও খোদাভীতি একজন মুমিনের তাই পরম আরাধনা হওয়া উচিত। প্রতিটি পদক্ষেপে মুমিন বেঁচে থাকবে রবের প্রতি ভয় ও তাঁর একান্ত অনুগ্রহের আশা নিয়ে।
উম্মু সালামা ছিলেন তাকওয়া ও খোদাভীতির বিরল উদাহরণ। আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি যেমন অপার ছিল তাঁর প্রত্যাশা তেমনি তাকওয়ার বিচারেও তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতীম। তাকওয়া বা খোদাভীতির সর্বোচ্চ প্রকাশ হলো আল্লাহ অপছন্দ করতে পারেন মনে হয়—এমন কাজ থেকেও বেঁচে থাকা। একজন প্রকৃত মুত্তাকী প্রমাণিত হারাম ও রবের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা থেকে তো দূরে থাকেনই তিনি দূরে থাকেন সন্দেহ থেকেও। উম্মু সালামা ছিলেন তাকওয়ার এই সর্বোচ্চ স্তরের মুত্তাকী। আল্লাহ নারাজ হতে পারেন—সামান্য সন্দেহও জেগে উঠতো মনে এমন কাজও তিনি এড়িয়ে চলতেন প্রবল দৃঢ়তার সাথে।
কৃতদাসের সঙ্গে পর্দা করা জরুরী নয়। ইসলাম নারী মুনিবকে এই অবকাশ দিয়েছে। উম্মু সালামার একজন গোলাম ছিল: নাবহান। তার সাথে তিনি পর্দা করতেন না। কিন্তু একদিন নবিজীকে তিনি বলতে শোনেন “যদি তোমরা কোনো গোলামের সাথে কিতাবাতের চুক্তি করো আর তার যদি সেই মূল্য পরিশোধের সমর্থ থাকে তাহলে তার সাথেও পর্দা করতে হবে” সেদিন থেকে নাবহানের মুখোমুখি হওয়া তিনি বন্ধ করে দিলেন। এবং তাকেও সংবাদ পাঠিয়ে দিলেন যেন সে আর উম্মু সালামার সঙ্গে খোলাখুলি দেখা সাক্ষাৎ না করে। গোলাম এবং নিজের মাঝে তিনি পর্দা ফেলে দিলেন। কারণ, নাবহানের সাথে তিনি কিতাবাতের চুক্তি করেছিলেন। অবশ্য দুই হাজার দিরহাম বকেয়া ছিল। কিন্তু সেই দিরহাম পরিশোধের সমর্থ ততক্ষণাৎ ছিল নাবহানের। রাসুলের মুখে নিষেধাজ্ঞা উচ্চারিত হবার পর আর মুহুর্তখানিকও বিলম্ব করেননি উম্মু সালামা। এটাই তার তাকওয়া৷ এমনই ছিল তার খোদাভীতি। [15]মুসনাদে আহমাদ– ৬/২৭৯
যাদের মাঝে দুধপানের সম্পর্ক আছে তাদের পরস্পরে দেখা সাক্ষাতেও নিষেধাজ্ঞা নেই। যেমন দুধ সন্তান, দুধ ভাই। একজন নারীর জন্য রক্ত সম্পর্কের সন্তান, রক্ত সম্পর্কের ভাই—এদের সাথে যেমন পর্দা করা জরুরী নয় তদ্রুপ দুধ সন্তান ও দুধ ভাই প্রমুখের সাথেও পর্দা করা জরুরী নয়।
আম্মাজান আয়িশার কাছে কেউ এসে যদি বলতো অমুক ছেলের আমার পরিবারে যাতয়াত বেশি। তার সাথে পর্দা করা একটু কঠিন হয়ে যায়। তখন আয়িশা তাকে নিজস্ব ইজতেহাদ ও বোধ সমর্থের অনুসারে পরামর্শ দিয়ে বলতেন—তাকে পাঁচ ছয় ফোঁটা বুকের দুধ পান করিয়ে দুধ সন্তান বানিয়ে নাও। তাহলে আর সমস্যা হবে না। আয়িশা এই কাজের বৈধতার জন্য সালিমের ঘটনা হাজির করতেন। নবিজী সালিমের ব্যাপারে এমন বৈধতা দিয়েছিলেন।
উম্মু সালামা সতর্কতা স্বরূপ এমন করাটা ভালো মনে করতেন না। তার সিদ্ধান্ত ছিল—দুধের সম্পর্ক শৈশবেই হতে হবে। বড় হবার পর যতই দুধ পান করুক না কেন তাদের মধ্যে দুধের সম্পর্ক তৈরী হবে না। উম্মু সালামা বলতেন—এভাবে দুধ পান করে কেউ যেন আমার সামনে আসার সাহস না করে। তিনি মনে করতেন সালিমের ঘটনাটা একান্তই সালিমের সাথেই সম্পর্কিত। নবিজী বিশেষভাবে তাকে এই অনুমতি দিয়েছিলেন।
আমাদের বর্তমান সময়ের মায়েদের কথা চিন্তা করলে হতাশই হতে হয়। সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকা তো দূরের কথা; স্পষ্ট হারাম ও নিষেধাজ্ঞা থেকেও নিজেদের বাঁচাবার কোনো গরজ তারা অনুভব করেন বলে মনে হয় না। পরিণাম যতদূর ভয়ঙ্কর হবার তেমনই হচ্ছে। দীন পালনে আমাদের মায়েদের ব্যর্থতার দায় বহন করে চলেছে সমস্ত সমাজ। একটি সন্তান মায়ের মুখে তো কেবল প্রথম বুলিই শেখে না; দীনদারি তাকওয়া এং খোদাভীতির প্রাথমিক বিদ্যাপীঠ ও তো ওই মা ই। এত শিক্ষিত মা দিয়ে সমাজ আর কতদূর এগিয়ে যাবে! যদি একজন মা তাকওয়ার বিচারে হতে না পারেন উম্মু সালামাসম পরহেজগার, আল্লাহভীরু এবং মুত্তাকী।
ছয়,
দাম্পত্য সুখকর হবার জন্য স্বামী স্ত্রীর একে অপরকে বোঝাটা অত্যন্ত জরুরী। যে সম্পর্কের উভয় দিকের বোঝাপড়াটা সুন্দর হয় তাদের সামষ্টিক জীবন হয় তত সুখের। আমাদের সমাজে এই যে এত কলহ আমরা আজ দেখে উঠি তার অধিকেরই সূত্রপাত পরস্পরকে পরস্পরের বুঝে ওঠার ব্যার্থতা থেকে। সমাজের সুস্থতার জন্য নবী পরিবারের দিকে দৃকপাত ছাড়া আমাদের দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই।
নবিজী তার প্রতিজন স্ত্রীকেই বুঝতেন একান্তভাবে। স্ত্রীরাও ছিলেন তেমন। উম্মু সালামার কাথাই বলি–নবিজীর মুখ দেখলেই তিনি তার ভেতর পর্যন্ত পড়ে ফেলতে পারতেন। চেহারার রঙ দেখেই বুঝে উঠতেন তাঁর মানসিক স্থিতি কিংবা অস্থিরতার আদ্যোপান্ত।
একদিন সেজেগুজে বসে আছেন উম্মু সালামা। নবিজীর অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ। নবিজী ঘরে এলেন। চোখ রাখলেন উম্মু সালামার দিকে। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি উম্মু সালামার ওপর স্থায়ী হলো না বেশি সময়। চোখ দ্রুতই অন্য দিকে ফিরিয়ে নিলেন। উম্মু সালামার বুঝে নিতে সময় লাগলো না–সমস্যাটা কোথায়! স্বর্ণের ভারী একটি হার গলায় ঝুলিয়েছেন উম্মু সালামা। নবি পত্নী হিসাবে এমন মূল্যবান সজ্জা নবিজীর বিশেষ মনঃপুত হলো না বোধহয়। উম্মু সালামা আর রা করলেন না। সাথে সাথে গলা থেকে খুলে ফেললেন সেই ভারী মূল্যবান গলাবন্ধ। গলা যখন হারশূন্য হলো নবিজী চাঈলেন উম্মু সালামার দিকে। এবং যথারীতি ভালোবাসা ও প্রেমসিক্ত নয়নে। [16]আল মু’জামুল কাবীর– ২৩/৪০৪
উম্মু সালামা এই যে নবিজীকে দ্রুত বুঝে নিতে পারতেন, পড়ে নিতে পারতেন অল্প সময়েই তার মনের ভাষা—উম্মু সালামার বুদ্ধিমত্তা সহায়ক ছিল তাতে। উম্মু সালামা কেবল প্রখর ধী শক্তির অধিকারিনীই ছিলেন না; বরং একটি বিষয় বুঝেও নিতেন চট করে, খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে।
একবার নবিজী বিষণ্ন মনে ঘরে এলেন। চেহারা তাঁর লাল হয়ে আছে চিন্তায়। ঘরে ঢুকেই নবিজী বলে উঠলেন, অকল্যাণ যখন বিস্তৃতি লাভ করবে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়াতে তার আযাব পাঠাবেন। উম্মু সালামা নবিজীকে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! পৃথিবীতে যে নেককার মানুষ থাকবে তাদের কী হবে!
নবিজী উম্মু সালামার জবাবে বললেন, হুম, নেককার মানুষও থাকবে। অন্য মানুষদের যে অবস্থা হবে তাদেরও তাই হবে। এরপর আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা মাফ করবেন এং তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।
নবিজী যখন ঘরে আসেন তার পূর্বে একজন নারী উম্মু সালামার কাছে এসেছিলেন। নবিজীকে দেখে তিনি ঘোমটা টেনে একটু আড়ালে চলে যান। উম্মু সালামা এবং নবিজীর মধ্যকার কথোপকথন স্পষ্টই শুনছিলেন তিনি। কিন্তু আলাপন শেষে নবিজী যখন আবার বাইরে চলে যান সেই নারি এসে উম্মু সালামাকে আবদার করেন এই কথাগুলো তাকে বুঝিয়ে দেবার জন্য। তিনি এবং উম্মু সালামা দুজনেই শুনলেন নবিজীর কথা। উম্মু সালামা সব যথার্থ বুঝে নিলেন। বিপরীতে সেই নারী কিছুই বুঝে উঠতে পারলেন না। [17]মুসনাদে আহমাদ– ৬/২৯৪, ২৯৫
সাত,
বিনয় ছিল উম্মু সালামার অন্যতম অলঙ্কার। বিশ্বনবীর সহধর্মিণী তিনি, বিদ্বান, দীনি শিক্ষার আধার, রাসুলের মুখপাত্র, ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী–কিন্তু অহংকারের বিন্দুমাত্র ছিটেফোটা ও ছিল না তার মধ্যে। কথা কিংবা কাজে অহং বা বড়াই–এর কোনো প্রকাশ তার মাঝে দেখা যায়নি কোনোদিন। বিনয় যার স্বভাব, নম্রতা-নমনীয়তা যার ভূষণ তার থেকে অবশ্য বিনয়হীনতার কল্পনাও করা যায় না। উম্মু সালামা স্বভাব-বিনম্র ছিলেন। তিনি চাইলেও হয়তবা জোরপূর্বকও নিজের মধ্যে বড়ত্বের ভাব আনতে পারতেন না–এমনই বিনীত মানুষ ছিলেন উম্মু সালামা।
প্রথম যেদিন সঙ্গিনী হয়ে রাসুলের ঘরে এলেন তিনি সেদিনই গম পিষে রুটি বানাতে বসে গেলেন। অথচ তিনি তখন নতুন বউ। তিনি চাইলে সেদিন ঘরে এসেই গৃহস্তালির কাজে লেগে না গেলেও পারতেন। নতুন বউ তিনি, তিনি কেন আজ এসেই রুটি বানাতে যাবেন। বাড়িতে তো আরও মানুষ আছে। তারা বরং খাবার তৈরি করে এনে সামনে হাজির করবেন তার—এই সব ভাবনায় তিনি ভাবিত হতে পারতেন। এবং সেসব যথার্থই ছিল বোধ করি। কিন্তু এমন সব অহং তাকে স্পর্শ করতে পারে না। বিনয় তার মুখের ঘোমটা সরিয়ে দেয়। তাকে নিয়ে হাজির করে চাকতির পাশে। কোনো প্রকার অহং রাসুলের খেদমতে তাকে বাঁধা দিয়ে রাখতে পারে না। আরবের একজন সম্ব্রান্ত নারী তিনি এবং বিশ্ব-শাহানশাহর রানী–এসব চিন্তা মুহুর্তের জন্যও তাকে তার বিনয় ভুলিয়ে দিতে পারে না।
বুকের দুধ পান করানোও কিন্তু আরব রিতীতে একটি গর্বের বিষয় ছিল। কে কোন বংশের সন্তানের মুখে তার স্তন তুলে দিল এসবও তুল্যায়িত হতো মর্যাদার তুলাদণ্ডে। কোনো স্বাধীন নারী কোনো গোলামের সন্তানের মুখে স্তন তুলে দেবে—এ ছিল কল্পনারও অতীত। কিন্তু বিনয় উম্মু সালামাকে দিয়ে সেই কল্পনাতীত কাজটিই করে দেখিয়েছে।
তার বাদী উম্মুল হাসানের সন্তান ছিল হাসান। উম্মু সালামার ঘরেই সে প্রতিপালিত হতো। একদিন তার মা কোনো এক কাজে গেছে তাকে রেখে। অকস্মাৎ ক্ষুধার যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠে উম্মুল হাসানের শিশুপুত্র হাসান। মা কাছে নেই। সন্তান ক্ষুধার জ্বালায় ভারি করে তুলছে আকাশ। উম্মু সালামার এটা সহ্য হলো না। গোলাম মুনীবের পর্দা ছিঁড়ে স্তন তুলে দিলেন শিশু হাসানের মুখে। একবারও ভাবলেন না তিনি কে! একবারও চিন্তা করলেন না কার সহধর্মিণী তিনি! একটিবারের জন্যও ভাবিত হবার প্রয়োজন বোধ করলেন না তার মর্যাদার অত্যুচ্চতা সম্বন্ধে! বিনয়ের সামনে সবকিছু তুচ্ছ করে নেন উম্মু সালামা। তার বিনয়ের প্লাবনের সামনে সমস্ত মিথ্যা অহং, অসংলগ্ন সব কৌলীন্য ভেসে যেতে থাকে তুচ্ছ খড়কুটোর মতোন।
উম্মু সালামার আলোকজ্জ্বল এ আখ্যান ফুরোবার নয়৷ রাত পেরিয়ে ভোরের উদয় হবে৷ ভোর শেষ হয়ে পৃথিবীর পরে নেমে আসবে ফের নতুন রাত৷ তবু, শেষ হবার নয় উম্মু সালামার দিপান্বিত জীবনের এই কান্তিময় সাতকাহন৷ তিনি ছিলেন অলোক মানস এক৷ ইসলাম দীন ও রাসুলের তরে নিবেদিত এক অনন্য প্রাণ৷ জগতব্যাপী মুমিন সমস্তের জন্য এক অতুল্য সন্দীপন৷
আহ্, উম্মু সালামা! দীনের জন্য কত অসহ্য যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়েছিলেন আপনি! কি সীমাহীন ত্যাগ ও তিতীক্ষায় ভাস্বর করে তুলেছেন আপনার জীবন! রাসুলের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসায় কী অত্যূচ্চ আসনে আসীন করেছেন আপনি নিজেকে! ইতিহাস আপনাকে ভুলে যাবে তা কী করে হয়! পৃথিবীর সমস্ত মুমিন আপনাকে ও আপনার আত্মত্যাগকে দেখুন আজও কেমন স্মরণ করছে শ্রদ্ধার সাথে! এবং এভাবেই আপনি বরিত হতে থাকবেন পৃথিবীর মানুষের কাছে যতদিন ওই সূর্যটা আলো ছড়িয়ে যাবে; পৃথিবীর কোলে স্নিগ্ধতা ঢেলে যাবে রাতের চাঁদ৷
হে উম্মু সালামা! হে আত্মার আত্মীয়া! কদমে আপনার নিবেদিত হোক আমাদের প্রেমের বকুল।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | বুখারী– ৪৯১৩ |
|---|---|
| ↑2 | আ‘লামুন নিসা–৫/২২৫ |
| ↑3 | সুরা তাওবা– ১০২ |
| ↑4 | সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ– ৩/১৮৭ |
| ↑5 | মাওসুয়াতু উম্মাহাতুল মুমিনীন– ১৪৬–১৪৭ |
| ↑6 | আহযাব– ৩৩ |
| ↑7 | আল মু’জামুল কাবীর– ২৩/৩৫৭ |
| ↑8 | মাওসুয়াতু উম্মাহাতুল মুমিনীন– ৩১৫ |
| ↑9 | আহযাব– ৩৫ |
| ↑10 | মুসনাদে ইমাম আহমাদ– ৬/৩০১ |
| ↑11 | সুরা নিসা– ৩২ |
| ↑12 | সুরা আল ইমরান– ১৯৫ |
| ↑13 | ফাতহুল বারি– ৯/৫ |
| ↑14 | সহীহ বুখারী |
| ↑15 | মুসনাদে আহমাদ– ৬/২৭৯ |
| ↑16 | আল মু’জামুল কাবীর– ২৩/৪০৪ |
| ↑17 | মুসনাদে আহমাদ– ৬/২৯৪, ২৯৫ |
