শায়লা আলম সকাল থেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছেন৷ মাহাবুব সাহেব ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছেন৷ কিন্তু স্ত্রীর কান্না থামানোর কোন উদ্যোগ তার মধ্যে দেখা যাচ্ছে না৷ গত রাতে খবর এসেছে শায়লা আলমের ছোট মামা স্ট্রোক করে মারা গেছেন৷ এই মামা খুব আদর করতেন শায়লা আলমকে৷ মামার মৃত্যুতে আদুরে ভাগ্নী কাঁদবেন— এটা আর অস্বাভাবিক কী! কান্না থামানোর চেষ্টা বরং অস্বাভাবিক মনে হয় মাহাবুব সাহেবের কাছে৷ তাকে তাই কান্নাজনিত ভাবনা দূরে রেখে টাইয়ের নট নিয়ে বেশি চিন্তিত দেখা যায়৷ টাই বাঁধাটা তার কাছে বড্ড বিরক্তিকর লাগে৷
এই যে শায়লা আলম সকাল থেকে খানিক বিরতি দিয়ে দিয়ে কেঁদে চলেছেন তার কারণ কি কেবলই মামার মৃত্যু সংবাদ! মৃত্য সংবাদ কান্নার উদ্রেক করছে বটে তবে তার সাথে মাহাবুব সাহেবের পোশাকজনিত বিষয়ও জড়িত৷ কিছুদিন হলো মাহাবুব সাহেবের মধ্যে চোখে পড়ার মতো একটা পরিবর্তন এসেছে৷ তিনি অকস্মাৎ নরমাল প্যান্ট সার্ট ছেড়ে স্যূট টাই পরা শুরু করে দিয়েছেন৷ সেটা কোন সমস্যা না৷ স্যূট টাই তিনি আগেও পরেছেন৷ চোখে পড়ার যায়গাটা হলো তিনি অফিসেই কেবল নয় বরং হাটে-বাজারে সর্বত্র তার একমাত্র ছাই রঙা স্যূট ও কমলারঙের টাই পরে যাতায়াত শুরু করেছেন৷ ভোরের নির্মল বাতাসে তার যে প্রাত্যহিক হাঁটাহাঁটি সেটাও আজকাল স্যূট বুট সহকারেই করছেন৷ মানুষজন তার দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকে, তার দিকে আঙুল তাক করে হাসাহাসি করে তিনি সেসবের থোরাই পরোয়া করেন৷
আজ এই সকাল বেলা, যখন তারা ছোটমামার যানাযাতে যাবার জন্য মনস্থির করেছেন, তখনও মাহাবুব সাহেব পরিধানের জন্য তার সেই ছাই রঙা স্যূট আর কমলা রঙের টাই হাতে নিয়েছেন৷ শায়লা আলম বিরক্তি নিয়ে একবার বলেছেন: আজকের দিনেও তোমার এই বাবুয়ানা সাজ না দিলে হয় না! যানাযা পড়তে যাবা৷ আজ অন্তত এসব রেখে পাজামা পাঞ্জাবী পরো!
মাহাবুব সাহেব শায়লা আলমের কথা কিছু শুনলেন বলে মনে হলো না৷ শুনলে তাকে এখন আর টাইয়ের নট নিয়ে ব্যতিব্যস্ত দেখা যেত না৷
২,
মাহাবুব সাহেব একটি কানাডিয়ান এনজিওতে কর্মরত৷ তার দায়িত্ব বিভিন্ন প্রজেক্টের আউটসাইড তদারকি করা৷ আট বছর আগে জাহাঙ্গীর নগর থেকে পাশ করে একজন সাধারণ মাঠকর্মী হিসাবে তিনি এই এনজিওতে জয়েন করেন৷ মাত্র বার হাজার টাকা বেতনের এই চাকরী জুটাতেও বহুজনের দুয়ারে ধর্না দিতে হয় তাকে৷ তারপর বহু পরিশ্রম অধ্যবসায় নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার বিনিময়ে তিনি নিজেকে আজকের এই অবস্থানে আনতে সক্ষম হয়েছেন৷ এখন মাহাবুব সাহেব অন্যের অধিনস্ত কেবল নয় তার অধিনেও অসংখ্য লোক কর্মরত৷ তাঁকেও বহুজন ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করে; পথিমধ্যে দেখা হলে পথ ছেড়ে একপাশে দাড়িয়ে যায়৷
মাহাবুব সাহেব পর্যন্ত অবাক৷ কি এমন জরুরী বিষয় হাজির হলো যার জন্য লাঞ্চ টাইম পিছিয়ে সভা ডাকতে হলো!
মাহাবুব সাহেবদের ডাইরেক্টর একজন কানাডিয়ান৷ তবে ছাব্বিশ বছর ধরে এ দেশে কাজ করার সুবাদে তাকে আর বিদেশি বলে মনে হয় না৷ সুস্পষ্ট উচ্চারণে বাংলা বলেন৷ তার বুদ্ধিও বাঙালিমার্কা হয়ে গেছে: প্যাঁচালো৷ অদ্ভুত অদ্ভুত পরিকল্পনা তার মস্তিষ্ক থেকে প্রসূত হয়৷ একবার তিনি একটি প্রজেক্ট লঞ্জ করলেন৷ কাজ হবে উপজেলা ভিত্তিক বৃক্ষ রোপন৷ তার আগে সবাইকে বনায়ন ও বৃক্ষের উপকারিতা সম্পর্কে বোঝাতে হবে৷ সে উদ্দেশ্যে দেশজুড়ে নানান ধরনের সভা সেমিনার কর্মশলার আয়োজন করলেন৷ সেসব শেষ হলে কয়েক হাজার কর্মী নিয়োগ করলেন বৃক্ষ গণনার কাজে৷ অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল “গাছ লাগালেই তো হলো৷ গোনার দরকার কি!” উত্তরে ডাইরেক্টর সাহেব বলেছিলেন “আমাদের কর্মশালার পর মানুষ কি পরিমাণ সচেতন হলো, কতগুলো গাছ বৃদ্ধি পেল এটার হিসাব লাগবে না! তবেই না বোঝা যাবে আমাদের উদ্যোগ কতোটা সফল!”
কিন্তু মাহাবুব সাহেবকে তিনি আসল কথাটা বলেছিলেন: এত বড় ফান্ড আসছে বাইরে থেকে সেগুলোর একটা প্রোপার কস্ট দেখাতে হবে না! মাহাবুব সাহেব ডাইরেক্টর সাহেবের এসব কাজে কখওনই কোন আপত্তি করেন না৷ জুনিয়রদের অনেকেই আপত্তি তোলে৷ বলে: গাছ না গুনে এই ফান্ড দিয়ে বেকার দূরীকরণে স্থায়ী কিছু করা হোক৷ কিন্তু জুনিয়রদের এসব আপত্তি কানাঘুষার মধ্যেই মিইয়ে যায়৷ ডাইরেক্টর সাহেবের কান পর্যন্ত সে সব যায় না৷ কিংবা মাহাবুব সাহেব যেতে দেন না৷ কারণ ডাইরেক্টর সাহেবের এতসব উদ্যোগে তার তো কোন লস হয় না; বরং লাভই হয়৷ বৃক্ষ গণনার সেই প্রজেক্টে যে মাঠ কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তাদের থেকে মিষ্টি খাওয়া বাবদ যে মোটা অংকের টাকা নেয়া হয় তার একক ভাগীদার মাহাবুব সাহেবই ছিলেন৷ নিছক মুখ বন্ধের জন্য জুনিয়র দুয়েকজনের মুখে পুরেছিলেন কিছু৷ নতুবা নিজের পাতে অন্যের হাত তিনি মোটেই পছন্দ করেন না৷
৩,
কানাডিয়ান ডাইরেক্টর এক দুপুরে জরুরী সভা ডাকলেন৷ মাহাবুব সাহেব পর্যন্ত অবাক৷ কি এমন জরুরী বিষয় হাজির হলো যার জন্য লাঞ্চ টাইম পিছিয়ে সভা ডাকতে হলো! অথচ তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়েও ডাইরেক্টর সাহেব প্রথমে মাহাবুব সাহেবের সাথে গোপনে আলাপ সেরে নেন ফের বাকীদের জানান৷ মাহাবুব সাহেবের পদোন্নতি প্রাপ্তির পর আজই প্রথম ব্যতিক্রম ঘটলো৷ ফলে সভাকক্ষে উপস্থিত অন্যদের মতো মাহাবুব সাহেবও উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলেন৷
ডাইরেক্টর সাহেব শশব্যস্ত হয়ে সভাকক্ষে প্রবেশ করলেন৷ এক পলক সবার দিকে তাকালেন৷ উপস্থিত সকলকে বেশ মনযোগী মনে হলো৷ সবাই যেন তার কথা শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে৷ ডাইরেক্টর সাহেব সামান্য হাসলেন৷ নিঃশব্দ হাসি৷ তিনি এমনই সবাইকে উৎকীর্ণ দেখতে চেয়েছিলেন৷ তার এত বছরের চাকরী জীবনে এটাই বড় প্রজেক্ট৷ এত বড় ফান্ড নিয়ে কাজ করার সুযোগ এর আগে তিনি কখনও পাননি৷ তার চাকরীর মেয়াদও শেষ হয়ে আসছে৷ এই প্রজেক্ট তিনি স্মরণীয় করে রাখতে চান৷ সবাইকে ভাল করে তাই বুঝিয়ে দেয়া প্রয়োজন এই প্রজেক্টে কতটা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে প্রত্যেককে৷
গলা খাঁকারি দিয়ে ডাইরেক্টর সাহেব কথা শুরু করলেন
: এ অসময়ে আপনাদের ডাকতে হলো দেখে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত৷ বিষয়টি খুবই জরুরী এবং একই সাথে আমাদের এনজিওর জন্য আনন্দেরও৷ এ কারণে জরুরী তলব৷ আমার আসলে বিলম্ব করতে মন চাইছিল না৷ ভাবলাম আনন্দ সংবাদ আপনাদের সাথে যতো দ্রুত শেয়ার করা যায়!
ডাইরেক্টর সাহেব এতটুকু বলতেই সবার চেহারাতে একটি স্বস্তি ফিরে এলো৷ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো কারও কারও চোখ৷ এনজিওর জন্য যেটা আনন্দ সংবাদ সেটা সকল কর্মীদের জন্যও নিশ্চয় আনন্দেরই হবে৷
ডাইরেক্টর সাহেব বলে চলেন
: আপনাদের কারওরই অজানা নয়, নাফ নদি পেরিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসছে আশ্রয়ের জন্য৷ আমাদের প্রধানমন্ত্রী, যাকে অলরেডি গোটা বিশ্ব মাদার অব হিম্যানিটি অভিধায় ভূষিত করেছে, তিনি এই ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ তাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন৷ তাদের চিকিৎসা ও খাদ্যের যোগান দিয়ে যাচ্ছেন৷ বেশ ক’টি এনজিও ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ তারা বিভিন্নভাবে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে কাজ করে যাচ্ছে৷ আমাদের সংস্থাও তাদের পাশে দাঁড়াতে চায়৷ আজই বেশ ভালো অঙ্কের একটি ফান্ড আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে৷ যার সম্পূর্ণটাই ব্যয় হবে রোহিঙ্গাদের কল্যাণে৷ এ খবরটি দেয়ার জন্যই মূলত আপনাদের ডাকা৷ কিভাবে আমরা কাজ করবো, ফান্ড কিভাবে ডিস্ট্রিবিউট হবে ইত্যকার বিষয় আগামিকাল আপনাদের জানিয়ে দেয়া হবে৷ আমরা কালক্ষেপণ করতে চাইছি না৷ আগামি পরশুর মধ্যে কাজ শুরু করে দিতে চাই৷ মানসিকভাবে আপনারা প্রস্তুত থাকবেন৷ ধন্যবাদ সবাইকে৷
৪,
সেদিন লাঞ্চের পর ডাইরেক্টর সাহেব মাহাবুব সাহেবকে তার রুমে ডেকে নিলেন৷ ডাইরেক্টের সাহেবের চকচকে চোখ আর তেলতেল অবয়ব দেখেই বুঝে নিলেন বেশ বড় ফান্ড তার হাতে এসেছে৷ এত আনন্দিত এর আগে তাকে কখনও দেখেছেন বলে মনে করতে পারলেন না তিনি৷ চেয়ার টেনে ডাইরেক্টর সাহেবের দিকে ঝুকে বসলেন মাহাবুব সাহেব৷
: বুঝলেন মাহাবুব, বেশ বড় প্রজেক্ট হতে যাচ্ছে এটা৷ গুছিয়ে এগোতে পারলে ভাল একটা মার্জিন থাকবে আমাদের হাতে৷
ডাইরেক্টর সাহেব মাহাবুব সাহেবের কানের কাছে মুখ এগিয়ে প্রায় ফিসফিসিয়ে বললেন কথাটা৷
: হুম৷
: আরে ভাই হুঁ হুঁ করলে তো হবে না৷ বারো কোটি টাকা৷ এটাকে কিভাবে ডিস্ট্রিবিউট করা যায় তার তো একটা প্রোপার প্ল্যান লাগে৷ কিছু সাইড করতে হলেও অনেক ভেবে চিন্তে করতে হবে৷ শোনা যাচ্ছে এ প্রজেক্ট শেষে ইনকয়ারি হতে পারে৷
মাহাবুব সাহেব এবার মুখ খুললেন
: বারো কোটি টাকা স্যার, খুব বেশি না৷ শরনার্থী শিবিরের যা অবস্থা সেখানে গিয়ে তাদের হাতে নগদ টাকা ধরিয়ে দিলেই মুহূর্তে শেষ হয়ে যাবে৷
: খুব বেশি না ঠিক৷ তবে আমাদের জন্য তো বেশিই৷ এর আগে এত বড় ফান্ড কি আমরা পেয়েছি! আর নগদ টাকা তো তাদের হাতে আমরা দিতে পারি না৷ গভর্মেন্টের নিষেধাজ্ঞা আছে৷ তাছাড়া আমাদেরও বলা হয়েছে স্থায়ী কিছু করার জন্য৷
ডাইরেক্টার সাহেব থামলেন৷ কিছু একটা ভেবে মাহাবুব সাহেবের দিকে তাকালেন৷ তার কণ্ঠ বেশ তরল
: রোহিঙ্গারা শিক্ষা-দীক্ষায় অনেক পিছিয়ে৷ তাদের জন্য স্কুল করলে কেমন হয়?
: স্কুল তো স্যার, ইউনেস্কো করছে৷ স্কুলগুলো তারা বেশ ভালোই চালাচ্ছে৷ আর সবাইকে স্কুল করতেও দেয়া হচ্ছে না বলে শুনেছি৷ বিশুদ্ধ পানির সেখানে বড় অভাব৷ গভীর নলকূপ করা যেতে পারে৷
: হুম৷
: তাছাড়া মেডিকেল ক্যাম্পও আমরা করতে পারি৷ নারি ও শিশুদের স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি ঘটছে৷
: হুম৷ ভালো বলেছেন৷ আমরা এদিকটাতেই তাহলে কাজ করি৷ আপনি তাহলে সব কিছু রেডি করে ফেলুন৷ কতটি নলকূপ স্থাপন করা যাবে এবং কতটা মেডিকেল ক্যাম্প কাজ করবে তার একটা খসড়া করে রাখুন৷ আর হ্যাঁ, আমরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রয়োজনীয় শুকনা খাবারও সার্ভাইভ করতে চাই৷ সেটাও হিসেবে রাখবেন৷
বড় শীতল ছিল ডাইরেক্টর সাহেবের চোখ৷ মাহাবুব সাহেব সে শীতল চোখের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারলেন না; দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেললেন৷
৫,
মাহাবুব সাহেবদের পরবর্তী দুই সপ্তাহ খুব ব্যস্ততার ভেতর অতিবাহিত হলো৷ সবচে’ ধকল গেল মাহাবুব সাহেবের ওপর দিয়ে৷ প্রজেক্টের ফিল্ড তদারকির দায়িত্ব তার; দৌড়ঝাপ তাই তাকেই করতে হয় বেশি৷ এ ক’দিনে তারা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে ত্রিশটি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন৷ ছয়টি মেডিকেল ক্যাম্প করে প্রায় বায়ান্ন হাজার রোগীর চিকিৎসা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবরাহ করেছেন৷ পঞ্চাশ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেছেন৷ সবচে’ বড় ঝক্কি পোহাতে হয়েছে খাবার বিতরণের বেলায়৷ যতই তারা চেষ্টা করেছেন সুশৃঙ্খলভাবে সবার হাতে পৌঁছে দিতে শরনার্থীরা ততই বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে৷ প্রতিজন কর্মী নাজেহাল হয়ে পড়েছে খাবার বিতরণ করতে গিয়ে৷ তারপরও সবার মধ্যে একটা স্বস্তি— যাক প্রজেক্টটা ভালোই ভালো শেষ হলো৷
প্রজেক্টটা শেষ হয়েছে এক মাসও হয়নি৷ এর মধ্যে অকস্মাৎ খবর এলো কানাডিয়ান ডাইরেক্টর সাহেবের স্থলে নতুন বস আসছেন৷ অনেকে অবাক হলো; কানাডিয়ান ডাইরেক্টর সাহেব নিজেও হলেন খানিকটা৷ এ দেশে তার আরও দু’ বছর থাকার কথা ছিল৷ কিন্তু কেন যে সংস্থা তাকে কানাডা ফিরিয়ে নিচ্ছে তার কাছে স্পষ্ট নয়৷ এক সন্ধ্যায় অশ্রুসিক্ত বিদায়ের ভেতর দিয়ে তিনি বাংলাদেশ ছাড়লেন৷
৬,
নতুন ডাইরেক্টর সাহেবও কানাডিয়ান৷ উচ্চতায় পাহাড় যেন৷ একদমই বাংলা জানেন না৷ এসেই একজন বাঙালি মেয়েকে সেক্রেটারী নিয়োগ দিয়েছেন৷ ইংরেজী কম জানা লোকদের সাথে ওই সেক্রেটারীর সহায়তায় বাতচিত সারেন৷ নতুন ডাইরেক্টর সাহেবকে দেখে প্রথম যে প্রশ্নটি সবার মাথায় হাজির হয়— এত কম বয়সী ছোকরা এত বড় এনজিও চালাতে পারবে তো!
কিন্তু মাহাবুব সাহেব জেনে গেছেন বয়স কম হলেও বুদ্ধি নিয়ে চলে নতুন ডাইরেক্টর সাহেব৷ এটাতো ছোট্ট একটা এনজিও মাত্র৷ বড় কোন কমার্শিয়াল কম্পানিও এই ‘ছোকরা’ তার আঙুলের ইশারায় চালিয়ে নিতে পারবেন৷
এটা মাহাবুব সাহেব বুঝে গেছেন সেদিনই যেদিন নতুন ডাইরেক্টর তাকে তার কামরাতে একান্তে ডাকেন৷ কামরাতে ঢুকেই তিনি আঁচ করতে পেরেছিলেন নতুন ডাইরেক্টর তাকে কোন ঝামেলাতে ফেলতে চাচ্ছে৷ কিন্তু সে ঝামেলা যে এত বড় আপদ হয়ে মাহাবুব সাহেবের কাঁধে সওয়ার হবে তা তিনি টের পাননি৷
বড় শীতল ছিল ডাইরেক্টর সাহেবের চোখ৷ মাহাবুব সাহেব সে শীতল চোখের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারলেন না; দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেললেন৷ কণ্ঠে বেশ কৌতুক মিশিয়ে ডাইরেক্টর সাহেব মাহাবুব সাহেবের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন
: কয়টা নলকূপ আর অষুধ-পাতি কিনতেই বারো কোটি টাকা খরচ হয়ে গেল মাহাবুব সাহেব!
এমন জিজ্ঞাসার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি৷ সাপের মতো জিহ্বার আগা বের করে ঠোট ভিজিয়ে নিলেন
: আরও আনুষাঙ্গিক খরচাদি আছে তো, স্যার! শুকনা খাবার বিতরণেও বেশ মোটা অঙ্ক বের হয়ে গেছে আমাদের৷
: হুম৷ কি পরিমাণ খাবার বিতরণ করেছেন সে হিসাব আছে আমাদের কাছে৷ আর বেকারী মালিকদের মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার চালিয়ে দেয়ার জন্য তাদের থেকে কত পার্সেন্ট পকেটে ভরেছেন সে খবরও আমরা নিয়েছি৷
মাহাবুব সাহেবর চেহারা মুহূর্তে পাংশুটে হয়ে গেল৷ কোন কথা খুঁজে পাচ্ছেন না তিনি৷ এরকম ভয়াবহ পরিস্থিতিতে এর আগে কখনও পড়েছেন বলে মনে করতে পারেন না৷ মাহাবুব সাহেবের মনে হচ্ছে— মৃত্যুর সময়টাও এ মুহূর্তের চাইতে কম অস্বস্তিকর হবে৷ কথা বলে উঠলেন ডাইরেক্টর সাহেবই
: আপনি এখন যেতে পারেন৷ তদন্ত শেষ হোক৷ অর্থ কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িতদের ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা অর্গানাইজেশন ঠিক করবে৷
মাহাবুব সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে যাচ্ছিলেন৷ ডাইরেক্টর সাহেবের কথায় আবার বসলেন৷
: আর শোনেন৷ আপনি যে কাপড়-চোপড় পরে অফিসে আসেন তা চেঞ্জ করতে হবে৷ এটা আপনার বাসা না৷ অফিসে ফরমাল ড্রেস পরে আসবেন৷ এসব জামা-কামড় বাসায় গিয়ে পরবেন৷
৭,
এ ঘটনার পরদিন অফিসের লোকেরা দেখল— মাহাবুব সাহেব ছাই রঙা একটি স্যূট আর কমলা রঙের একটি টাই পরে অফিসে এসেছেন৷ তাকে ভয়ঙ্কর রকম কিম্ভূত দেখাচ্ছে তাতে৷ তার চেহারাতে পূর্বের সেই আভিজাত্য নেই৷ কেমন তেলতেলে ভাব করে অফিসময় ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ আগের মতো সটান দাঁড়িয়ে কারও সাথে কথাও বলতে পারেন না তিনি কিংবা বলেন না৷ বরং কথা বলার সময় একটু ঝুকে থাকেন, যেনবা পড়ে যাবেন৷ এটা তার বিনয়ের কারণে, না ডাইরেক্টর সাহেব যে সেদিন বললেন— অর্থ কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িতদের ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সেই হুমকিতে ভীত হয়ে পড়ার কারণে তা বোঝা যায় না৷
তবে কিছুটা ভয় তিনি পেয়েছেনই৷ তদন্তে যদি বেরিয়ে আসে যে, বারো কোটি থেকে কিছু মার্জিন বাবদ এবং বেকারী মালিকদের থেকে পার্সেন্টিজ বাবদ সাড়ে তিন কোটি টাকা তার স্ত্রীর একাউন্টে জমা হয়েছে আর অর্গানাইজেশন যদি তার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয় যে তাকে সব অর্থ ফিরিয়ে দিয়ে চাকরীতে ইস্তফা দিতে হবে তবে তিনি কি করবেন! অনেক কাঠখোড় পুরিয়ে তবে এ চাকরীটি তিনি জুটিয়েছিলেন৷ চাকরী চলে গেলে এ বাজারে কে তাকে চাকরী দিবে! তার ওপরে কপালে থাকে যদি অর্থ কেলেঙ্কারীর তিলক!
মাহাবুব সাহবের বড় ভয়— এ টাকা যদি এখন অর্গানাইজেশন ফেরত চায় তাহলে কোত্থেকে জোগাড় করবেন তিনি এত বড় এ্যামাউন্ট! ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে তিনি যে সিঙ্গাপুর বেরিয়ে এলেন সেখানেই তো অর্ধেক ফুরিয়েছে!
সেদিন যে মাহাবুব সাহেব স্যূট-টাই পরে অফিসে গেলেন তারপর তাকে আর নরম্যাল পোশাকে দেখা যায় না৷ পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে সর্বত্র তাকে দেখা যেতে লাগল ছাই রঙা স্যূট আর কমলা রঙের টাইয়ে৷ মাহাবুব সাহেবের দৃঢ় বিশ্বাস— নতুন ডাইরেক্টর সাহেব স্যূটেট-ব্যূটেট লোকদের অধিক পছন্দ করেন৷ এ পছন্দ কি উপায়ে আরও বাড়িয়ে তোলা যায় তিনি সে ব্যাপারে অনবরত পরিশ্রম করে যাবেন৷ কিন্তু মাহাবুব সাহেব জানেন না— তদন্ত রিপোর্ট দেখে ডাইরেক্টর সাহেব যে সিদ্ধান্ত তার ব্যাপারে গ্রহণ করেছেন তার ছাই রঙের স্যূট কিংবা কমলা রঙের টাই সে সিদ্ধান্তে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আনতে পারবে না৷
৮,
অল্প ক’দিন পরের ঘটনা৷ সবাই দেখলেন মাহাবুব সাহেব রোজকার মতো স্যূট এবং বুট পরে মর্নিং ওয়াক করছেন৷ টাইটাও খুব দারুনভাবে গলায় ঝুলিয়েছেন৷ কিন্তু ভুলবশতঃ তিনি তার প্যান্টটা পরে আসেননি৷ তবে সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই৷ তিনি তেলতেলে হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে পার্কের ইট বিছানো রাস্তায় দৌঁড়ে চলেছেন৷
