“তিনিই আল্লাহ; তিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই৷” [1]সুরা হাশর, আয়াত: ২২
ইসলামের মূল ভিত্তি স্থাপিত তাওহীদের কালিমার ওপর৷ তাওহীদের কালিমা অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ পাঠ করে আল্লাহ তালার একত্ববাদের স্বীকারোক্তি প্রদান করার মধ্য দিয়েই ইসলামে প্রবেশ করতে হয়৷ এই কালিমার বিস্ময়কর ফলাফল হলো—কালিমাটি পাঠ করা মাত্র মানুষের জীবনে এক অভাবিত পরিবর্তন ঘটে যায়: যে ছিল আল্লাহতে অবিশ্বাসী কালিমাটি পড়ে ওঠা মাত্রই সে হয়ে পড়ে বিশ্বাসীদের দলভুক্ত৷ যে ছিল আল্লাহ তায়ালার ক্রোধের পাত্র সেই হয়ে ওঠে তাঁর একান্ত প্রিয় ভাজন৷ যার নসীবে লেখা ছিল জাহান্নাম তার জন্য ফায়সালা করা হয় চির সুখের জান্নাতের৷ আমার এই কথা কোন কাব্যিক অতিরঞ্জন নয়—মানুষকে জাহান্নামের তলানি থেকে উঠিয়ে মুহূর্তেই জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ আসনে সমাসীন করে যে কালিমা তা এই তাওহীদের কালিমা৷ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ রসুল—এই মহান কালিমাতে পূর্ণরূপে সমর্পণই মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায়৷
একত্ববাদে বিশ্বাসী যে তার কিছু আবশ্যিক কর্তব্য আছে৷ সে আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় কারুর ওপর ভরসা রাখবে না৷ সকল কাজে সমানে রাখবে আল্লাহ তায়ালাকেই৷ আল্লাহ তায়ালার বিধান থেকে কখনও পলায়ন করবেন না; তা বাহ্যত যতো অসম্ভবই মনে হোক না কেন! আল্লাহ ছাড়া শপথ বাক্য উচ্চারণ করবে না সে কারুর নামে৷ দ্বিতীয় কারুর ভয়কে তার অন্তরে যায়গা দেবে না৷ সে অনুতপ্ত হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছে৷ রব এবং ইলাহ হিসাবে সে হৃদয়ে স্থান দেবে না পৃথিবীর অন্য কিছুকে, অন্য কাউকে৷ এটাই হলো তাওহিদের কালিমার দাবী৷ এর বিনিময়েই জাহান্নামকে হারাম করা হবে তার জন্য৷
মুয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু একদিন নবিজীর পেছনে বসে কোথাও যাচ্ছিলেন৷ নবিজী অকস্মাৎ তার দিকে ফিরে তাকালেন৷ তাকিয়ে বললেন, তুমি জানো বান্দার ওপর আল্লাহর হক কী? আর আল্লাহ তায়ালর ওপরেই বা বান্দার কী হক?
মুয়াজ বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলই ভালো জানেন৷
নবিজী এবার বলেন, বান্দার ওপর আল্লাহর হক হলো সে কেবল তাঁরই ইবাদাত করবে৷ এবং তাঁর সাথে শরীক করবে না অন্য কাউকে৷ আর আল্লাহ তায়ালার ওপর বান্দার হক হলো যে ব্যক্তি তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে না তিনি তাকে শাস্তি দিবেন না৷
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু একবার নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সব চাইতে বড় অপরাধ কী!
জবাবে নবিজী বলেছিলেন, যে আল্লাহ তোমাকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর কোনো সমকক্ষ নির্ধারণ করা৷ এটাই সব চাইতে বড় অপরাধ৷
আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
আমি প্রতিটি জাতির মধ্যে রাসুল পাঠিয়েছি৷ এই নির্দেশ প্রদান করে যে, তোমরা আল্লাহ তায়ালার ইবাদাত করো৷ আর বেঁচে থাকো তাগূত থেকে৷ [2]সুরা নাহাল, আয়াত ৩৬
উলামায়ে কেরাম বলেন, আল্লাহ ছাড়া আর যা কিছুরই উপাসনা করা হয় সেটাই তাগূত৷
আল্লাহ তায়ালা সকল রাসুল পাঠিয়েছেন এই মহান লক্ষ্যে—মানুষ যেন তাঁর সাথে কোনো কিছুর অংশীদারিত্ব নির্ধারণ না করে৷ যেন মানুষ কাউকে তার সমকক্ষ মনে না করে৷ কিন্তু আমরা সেই কাজটিই ছাড়তে পারছি না৷
আমরা যারা মুসলমান বলে সমাজে পরিচিত হয়তো তারা মূর্তির সামনে মাথা নত করছি না৷ হয়তো তারা আগুনের পুজা করছি না৷ কিন্তু শিরক থেকে কি সম্পূর্ণরূপে বেঁচে থাকছি! রবের বিধানের সাথে আমরা অন্যের বিধানকে মিলিয়ে ফেলছি৷ তাঁর সিফাতের সাথে অন্যকে অংশীদার বানিয়ে বসছি৷ কোনো না কোনোভাবে আমরা ছোটো বড় শিরকে আজ নিমজ্জিত৷ অফিসে বসে আল্লাহ তায়ালার সাথে শিরক করে আজান হলে নামাজে গিয়ে দাড়াচ্ছি৷ রোজা রেখে বিচারের এজলাসে বসে তাঁর সাথে শিরকে জড়িয়ে পড়ছি৷ হাদীসের মসনদে আসীন হয়েও বেঁচে থাকতে পারছি না শিরক থেকে৷ আবার শিরকযুক্ত এসব আমল সহই আমরা নাজাতের আশা নিয়ে দিন পার করছি৷ কিন্তু আমাদের কি জানা নেই—শিরকের কারণে আমাদের সকল আমল বরবাদ হয়ে যাবার কথা রাব্বে কারীম বলছেন৷ [3]দ্রষ্টব্য: আনআম- ৮৮
হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
হে আদমের সন্তান! যদি তুমি এক পৃথিবী গোনাহ নিয়েও আমার কাছে আসো, কিন্তু কোনোদিন আমার সাথে শিরক করোনি, তবে আমি এক পৃথিবী ক্ষমা নিয়ে হাজির হবো৷ [4]তিরমিযী
অনেক বেশি আমল করা জরুরী নয়৷ সারারাত কিয়ামুল লাইলে দাঁড়িয়ে পা ফুলিয়ে ফেলা আবশ্যক নয়৷ কিন্তু সামান্য ও অবধারিত আমল যা করবো তা খাঁটি ও শিরকমুক্ত হওয়া জরুরী৷
