মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহিমাহুল্লাহ ছিলেন হতভাগ্য উম্মাহর তেমনই এক মহীরুহ৷ অজ্ঞতার রোদ্দুরে পোড়া উম্মাহর জীবনে তিনি শীতল সুনিবিড় ছায়া হয়ে উঠেছিলেন, যেন পেলব স্নিগ্ধ ছায়াদায়ী বিশাল অশ্বত্থ৷ ছিলেন পথহারা মুসাফিরের দরদি রাহবার৷
জন্ম গ্রহন করেছেন উনিশ এপ্রিল উনিশশ পয়ত্রিশ সালে, কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার ছয়চির নামক গ্রামে; তার নানার বাড়িতে। আশি বছরের বর্ণাঢ্য জীবন তার৷ তার এ বিস্তৃত জীবন সমান্তরাল ভাবে বহমান ছিল না৷ কখনও উত্থান এসেছিল কখনও খানিক পিছুটান; বিস্তর চড়াই উতরাই পেরিয়ে তিনি হয়েছিলেন মাওলানা খান৷ একজন কিংবদন্তি৷ তার এ মহীরুহ হয়ে ওঠার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল থমকে দাড়িয়ে না পরা৷ তিনি জীবনে হোঁচট খেয়েছেন বহুবার, কিন্তু কখনও থেমে যাননি৷ উঠে দাড়িয়ে ফের নব উদ্যমে চলতে থেকেছেন সম্মুখ পানে৷ পেছন ফিরে তাকাননি পর্যন্ত একটিবার৷ যে বড় হয়, উম্মাহর রাহবার হয় সে এমনই হয়; তাকে এমনই হতে হয়৷ মাওলানা খানের এ বর্ণাঢ্য জীবন তাই যারা বড় হতে চায় তাদের জন্য অনুকরণীয়৷
কর্ম জীবনের শুরুর দিকে তিনি যুক্ত হন ‘দৈনিক পাসবানে’৷ ব্যতিক্রধর্মী কলাম লেখার মাধ্যেম অল্পদিনেই তিনি হয়ে ওঠেন একটি পরিচিত নাম; পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের মানুষের কাছেই৷ তারপর সেখান থেকে সরে এসে যুক্ত হন ‘সাপ্তাহিক আজ’ এ৷ ‘সাপ্তাহিক আজ‘য়েই তিনি নিজের স্বপ্ন-সাধনার সবটুকু ঢালে দেয়ার সুযোগ পেয়ে যান৷ সাপ্তাহিক আজ এর বদৌলতেই সে সময়কার প্রখ্যাত সব ব্যক্তির সাথে তার হার্দিক সম্পর্ক তৈরী হয়৷ যাদের সংস্পর্শে তিনি দারুনভাবে আন্তোলিত হয়েছিলেন৷
কিন্তু এক অযাচিত কারণে প্রিয় সাপ্তাহিক আজ বন্ধ হয়ে গেল; ভীষণ মনক্ষুণ্ন হলেন৷ খুব আন্তরিকভাবে সম্পাদনা করতেন সাপ্তাহিক আজ৷ একদমই জীর্ণদশা থেকে তাকে উঠিয়ে পাঠকের টেবিলে নিয়মিত হাজির করতে পেরেছিলেন৷ স্বপ্নের বিজতলা মনে করতেন তিনি সাপ্তাহিক আজকে৷
সাপ্তাহিক আজ হারিয়ে তিনি আশ্রয় খুঁজে পেতে চাইলেন নতুন স্বপ্নগৃহে৷ রক্ত পানি করা শ্রম ঢেলে বহুদিনের লালিত স্বপ্ন পশ্চিম পাকিস্তানের দারুল মুসান্নিফীনের আদলে প্রতিষ্ঠা করলেন দারুল উলুম ইসলামি একাডেমি৷ একঝাঁক নবীন মেধাবী লিখিয়েদের সাথে নিয়ে প্রথম বছরেই উপহার দিলেন একের পর এক অনবদ্য সব গ্রন্থ৷ সেসব গ্রন্থাবলী ছাড়াও তার প্রতিষ্ঠিত দারুল উলুম ইসলামি একাডেমির অন্যতম সাফল্য ছিল শক্তিমান কজন কলম সৈনিক বের হয়েছিল এই দারুল উলুম ইসলামি একাডেমি থেকে৷
একের পর এক স্বপ্ন-ভঙ্গের বেদনায় মুহিউদ্দীন খান তখন কিছুটা ক্লান্ত৷ তবে হতাশ নন; হতাশা কিম্বা নিরাশা প্রকৃত মু’মিন হৃদয় স্পর্শ করতে পারে না৷ মু’মিনের জীবনে বিষাদ এলে ক্ষণিক থমকে দাড়ায় বটে, থমকে দাড়াতে হয়; তবে পথচলা একদমই থেমে যায় না; স্থবির হয়ে পড়ে না৷ বরং রাব্বে কারীমের কাছে পেছনের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হয়ে সমুখে এগিয়ে যাবার হিম্মত প্রার্থনা করে৷ নব উদ্দমে উঠে দাড়ায় এবং পথ চলতে শুরু করে৷ হতাশার চাদর সরিয়ে যখন সে এগিয়ে যেতে থাকে দয়াময় তখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন৷
মুহিউদ্দীন খানের বেলায় কিছু ব্যতিক্রম হলো না৷ ব্যতিক্রম যে হবার নয়৷
যখন আর কোথাও আশার আলো দেখছেন না, নিভে গেছে সব স্বপ্ন প্রদীপ তখন, ঠিক সেই সময় এক নতুন স্বপ্নে তার দীপ্তিমান আঁখি যুগল ঝলমল করে উঠলো৷ নতুন এক আলোকিত ভোরের সন্ধানে তার হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে পড়লো৷ যেনবা মদীনার সবুজ গম্বুজ থেকে তার হৃদ-জমিনে এসে আঁছড়ে পড়েছে হেরার জ্যোতি; বিভাবিত আলোকচ্ছটা৷ সে আলোয় আলোকিত হয়ে তিনি জন্ম দিলেন এক কালজয়ী মহাকাব্যের: মাসিক মদীনা৷ হ্যাঁ…মহাকাব্যই তো! মহাকাব্য যেমন বলে চলে বিজয়ীর বিজয় গাঁথা মাসিক মদীনা তেমন একের পর এক শুনিয়ে যেতে থাকলো অনন্তকালের গৌরবগাঁথা; অনবরত দেখিয়ে চললো অনাস্বাদিত জীবনের মুক্তির পথ৷
এতদিনের লব্ধ অভিজ্ঞতা এবং খোদা প্রদত্ত মেধা ও মননের সমন্বয়ে মাসিক মদীনাকে তিনি নিয়ে গেলেন এক অনন্য উচ্চতায়৷ আর সেই উচ্চতা থেকে পবিত্র মদীনার সবুজ গম্বুজের উচ্চকিত আওয়াজ তিনি পৌঁছে দিলেন দেশের আনাচে-কানাচে; অজস্র মানুষের হৃদয়ের অলিন্দে৷
বস্তুত মাসিক মদীনা কেবল একটি পত্রিকা ছিল না; ছিল একটি আন্দোলন৷ অসত্যের ঝকমকা প্রাসাদ গুড়িয়ে তার ধ্বংসাবশেষের ওপর দাঁড়িয়ে সত্যের জয়গান সুউচ্চ করার এক অত্যুচ্চ মিনার ছিল মাসিক মদীনা৷ মাওলানা খানের সম্পাদনায় অনবদ্য সব সংখ্যা প্রকাশ হয়ে চলছিল৷ মাসিক মদীনাই প্রথম এ দেশে সীরাত সংখ্যা প্রকাশনার মাধ্যেমে বাংলাভাষী পাঠকের হাতে রাসুলের প্রোজ্জ্বল আদর্শ ও সমুন্নত জীবনের বার্তা পৌঁছে দেয়৷ নিয়মিত সীরাত সংখ্যা বের করা মাসিক মদীনা ও মাওলানা খানের বিরল দূরদর্শিতার অনন্য দৃষ্টান্ত ছিল৷ মাওলানা খানের আরেকটি সাফল্য ছিল একঝাঁক মেধাবী লেখক ও সাহিত্যমনষ্ক তরুণকে তিনি তার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ে শামিল করতে পেরেছিলেন৷ মিথ্যার মুখোমুখি বুক টান করে প্রাচীর হয়ে দাড়িয়ে যেতে তনি নিজে তাদের প্রস্তুত করেছিলেন৷ এ কাজে মাওলানা খানের মতো আন্তরিক ও বিচক্ষণ এখন পর্যন্ত কেউ আসেনি৷ তার হাতে প্রজ্জ্বলিত সে প্রদীপমালা আজও অন্ধকারে আলো বিলিয়ে যাচ্ছে৷ এবং সেসব জলন্ত প্রদীপ থেকে আলো গ্রহণ করে উদ্ভাসিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম৷ যে কারণে এদেশের বর্তমান প্রজন্ম এবং অনাগত সকলে ঝনী মাওলানা খানের প্রতি৷ যে ঝন অস্বীকার করা নির্লজ্জ কৃতঘ্নতারই নামান্তর৷
পঁচিশ জুন দুই হাজার ষোলতে তার দেহাবসান হয়েছে কেবল; মৃত্যু হয়নি৷ মুহিউদ্দীন খানেরা মারা যান না, হারিয়ে যান না৷ তারা অমর হয়ে থাকেন হাজারো মানুষের হৃদয়ে৷
