প্রথম যখন এ শহরে আসি ক্ষণে ক্ষণে একটা গোপন বাসনা মনের গহীনে জেগে উঠতো— এ নগরীতে এত লোকের বাস, চলতে পথে কত কিসিমের মানুষের সাথে ঠুকোঠুকি বাঁধে, কই, কোনোদিন কোন পরিচিত মুখের দেখা তো পাই না! অন্তত দুয়েকজন— যাদের সাথে স্কুলে-কলেজে সময় কাটিয়েছি, বেকার সময়ে এখানে-সেখানে ঘুরে-ফিরে বেরিয়েছি— পেছন থেকে তারস্বরে ডেকে তো বলে না— “তুহিন! আছিস কেমন?”
গত সাত বছরে আমি এ শহরের এক প্রকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে পড়েছি৷ তবে ঠিক ঢাকা শহরেই আমার নিবাস, তা নয়; শহরের সীমানার একটু বাইরে৷ বেশি দূর নয়; মাইল দশেক৷ বাড়িটি ভাল এবং পাড়াটি নিরিবিলি৷ আর নতুন চালু হওয়া ‘গেটলক’ সিটিং সার্ভিসের কল্যাণে অল্প সময়ের মধ্যেই কর্মস্থলে পৌঁছতে পারি৷ কোন হাঙ্গামা নেই; শুধু একটু জ্যামে-জটে পড়তে হয়, এই যা! তবে এটা তো এ নগরীতে বাসকারী প্রত্যেকেরই নিত্যদিনের সমস্যা৷ এ অসুবিধেটুকু বাদ দিলে আমি তো শহরে থাকার সুখ এবং পাড়া গায়ে থাকার শান্তি দুইই উপভোগ করি৷ ফলে সহকর্মীদের হিংসা কি ঈর্ষার কোপানলে পড়তে হয় বৈকি! তবে সেটাও আমার জন্য গোপন এক আনন্দ-বিহ্বলতার কারণ বটে৷
আমিও ক্রমে জীবন ঠেলে নেয়ার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ি; অতঃপর নির্লিপ্ত যাপিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠি
সে যাক৷ যে কথা বলছিলাম, সত্যিই এক সময় নগরীর পথে চলতে গেলে এমন ভাবনার উদয় হতো৷ শুনেছি জেলা শহর থেকে উঠে আসা প্রতিজন নাগরিকের এমন ভাবনা হয় প্রথম প্রথম৷ এক সময় কাজের চাপে ও সহকর্মীদের সাথে গোপন প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় পুরাতন চেনা মানুষের সাথে হঠাৎ দেখা হয়ে যাওয়ার সুখ-ভাবনা অতঃপর হারিয়েই যায়৷
আমার বেলাতেও তাইই হয়েছিল হয়তবা৷ সাত বছরের আধা নাগরিক জীবনে আমার ভেতরটা হয়তবা পাকাপোক্তভাবেই নাগরিকতার ধাতে রূপান্তর ঘটে যায়৷ আর আমিও ক্রমে জীবন ঠেলে নেয়ার প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ি; অতঃপর নির্লিপ্ত যাপিত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে উঠি৷
তবে মাস কয়েক আগের কথা৷
উত্তরার এক জনাকীর্ণ ফুটপাত দিয়ে দ্রুত হেঁটে চলছি৷ হঠাৎ দেখি— রফিক৷ বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুরে মেরুন রঙের গাইয়্যা প্যান্ট ও সবুজ-কালোর মিশেলে হাফশার্ট পরা কৃষ্ণকায় ছেলেটিকে চিনে নিতে সামান্য বেগ পেতে হলো না— আমাদের রফিকই বটে৷ ওর চেহারা এমন কিছু অসামান্য নয়; কিন্তু কদম ফুলের মতো খাড়া হয়ে থাকা চুল, অমন ঝুলে পড়া লম্বা নাক আর কারও হতেই পারে না৷
রফিককে ছেলেবেলা থেকেই চিনি৷ ওদের বাড়িতে লজিং থেকে সাইকেল দাবড়িয়ে পনর মাইল দূরের বিশ্বনাথপুর কলেজে হিসাব বিজ্ঞান পড়তো যে ছেলেটি, সে এই আমি— তুহিন হাসান৷ অতঃপর বর্তমানে সোনালি ব্যাংকের উত্তরা শাখার একজন চাকুরে৷ এখন বয়স বোধয় উনিশ-কুড়ি হবে রফিকের৷ আমি যখন বিশ্বনাথপুর কলেজে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ওদের বাড়ি থেকে চলে আসি তখন সে গ্রামের স্কুলে কোন এক ক্লাসে পড়তো আর খুউব ক্রিকেট খেলতো৷ সন্ধ্যা নামলে নিতান্ত বাবার ভয়ে আমার সামনে অঙ্কের বই খুলে বসতো আর মাথা চুলকাতো অংক মাথায় ঢুকতো না বলে! চেহারা কিছুই বদলায়নি রফিকের; একটু কেবল লম্বা হয়েছে৷ সেই ছেলে গ্রামের একটি পঙ্কিল পানা পুকুরের ঝাঁক থেকে ছিপের একটানে একেবারে রাজধানীর শুকনো ডানায় এসে কীভাবে পড়লো; সেটাই আমার কাছে এখন সাক্ষাৎ এক রহস্য৷
আমি কিছুটা উল্লসিত হয়ে পড়েছিলাম হয়তবা৷ আনন্দভেজা স্বরে ডাকলাম— “রফিক! তুই? এখানে?” রফিক একটা সস্তার হোটেল থেকে হাত মুছতে মুছতে বের হচ্ছিল৷ আমার ডাক শুনে কিছুকাল বুদ্ধিভ্রষ্টের মতো চেয়ে থাকলো৷ তারপর এক লাফে সামনে এসে দাড়িয়ে পড়লো৷ কিছু সময় পার হলো দু’জনই নির্বাক৷ তারপর হঠাৎই আমার হাত ধরে চোখ দু’টো বড় বড় করে বললো— “ফরিদ ভাই!”
বিস্ময় যেন ঠিক ওর কণ্ঠ থেকে নয় চোখ থেকে টপকে পড়ছিলো৷ তার বিস্ময়-বিহ্বলতার সেই সময়কার বর্ণনা দেয়া আমার জন্য কঠিনই বটে৷ হারিয়ে যাওয়া পাখির ছানা অচেনা পথের মাঝখানে হঠাৎই মা কে দেখতে পেলে যেভাবে অসংবৃত আনন্দে অধীর ও চঞ্চল হয়ে ওঠে, রফিকও তেমন আমাকে পেয়ে যেন একদমই আত্মহারা হয়ে পড়লো৷ কি বলবে, কি করবে কিছুই যেন ভেবে পায় না৷ ওর মুখে একটু জড়তার দোষ ছিল; কিন্তু এ মুহূর্তে ওর মুখ থেকে একদমই কথা সরে না যেন— “কী আশ্চর্য! আপনার সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে ভাবতেও পারিনি৷ আপনার টিকানাটা কাগজে লিখে এনেছিলাম৷ কেমন করে যেন তা পকেট থেকে হারিয়ে গেল! আর আপনাকে কীভাবে খুঁজি! এত্তবড় শহর! কোন চেনা মানুষ নেই! কপাল ভাল যে আপনার সাথে দেখা হয়ে গেল৷ না হলে…
এ কথাগুলো বলে রফিক যেন আমার পিঠে শপাং করে চাবুকের এক ঘা বসিয়ে দিল
আমি রফিককে থামিয়ে দিই৷ জিজ্ঞেস করি— “খেয়েছিস কিছু?” রফিক মাথা নেড়ে সায় দেয়৷ বলে— “হুম৷ খেয়েছি৷ কি বাজে এদের রান্না৷ তরকারিতে কাঁচা হলুদের গন্ধ৷ আর ভাত গিলতে যা কষ্ট হচ্ছিল না! রাবার যেন!
রফিকের কথা শুনে আমার খুব হাসি পায়৷ হাসি থামিয়ে বলি— “চল, বাসায় চল৷ তোর ভাবীর হাতের রান্না মন্দ না৷” রফিক চোখ কপালে তুলে বিস্ময় প্রকাশ করে— “আপনি বিয়ে করেছেন, তুহিন ভাই! কই, আমরা কিছুই জানলাম না যে!” আমি রফিককে বোঝাতে থাকি— “কাউকেই জানানো হয়নিরে! হটাৎ করেই হয়ে গেল সব৷ তোর আব্বা জানলে রাগ করবেন খুব৷”
“শুধুই আব্বা! আর তানজিলা বুবু! ভীষণ কষ্ট পাবে৷ জানো তুহিন ভাই! তানজিলা বুবু এখনও ভাবেন— তোমার সাথেই তার বিয়ে হবে৷ খুব কষ্ট পাবে, খুউব৷ তুমি কোন কাজ করলে!”
এ কথাগুলো বলে রফিক যেন আমার পিঠে শপাং করে চাবুকের এক ঘা বসিয়ে দিল৷ নিজেকে অপরাধী, জোচ্চোর মনে হচ্ছিল৷ তবে তা মুহূর্তের জন্যই৷ পরক্ষণেই ভাবলাম— কেন, আমি নিজেকে জোচ্চোর ভাবছি কেন! তানজিলার সাথে এমন কোন সম্পর্কেই জড়াইনি আমি কোনোদিন যাকে সে ভালোবাসা বলে চিহ্নিত করবে৷ দু’ একবার হেসে কথা বলেছি, মিষ্টি হেসে ওর দিকে চেয়ে থেকেছি এটাকে যদি সে ভালোবাসা মনে করে তবে এটা তার ভুল৷ এর দায় আমি নিতে যাব কেন!
এমন ভাবনার মাঝে বাস এসে থামে৷ আমি রফিককে নিয়ে বাসে উঠে বসি৷ বাসে উঠেই রফিক তার কথার ঝাঁপি খুলে বসে৷ গ্রামে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া তাবৎ ঘটনার বিবরণ একে একে দিতে শুরু করে৷ করম আলীর বউ অন্যের সাথে পালিয়ে যাওয়াতে করম আলীর কেমন মাথা খারাপ হয়ে যায় অতঃপর গ্রামজুড়ে সে কেমন পাগলামি শুরু করে বাদ যায় না সে সবও৷ আমি রফিকের সব কথা শোনার আগ্রহ পাই না৷ আমার ভাবনাতে তানজিলা এসে আবারও হাজির হয়৷
মেয়েটা একটু পাগলাটে ছিল; ভীষণ জেদিও৷ জেদীরাই বোধ করি একটু পাগলাটে হয়৷ কিন্তু তারপরও সব ছাপিয়ে সুন্দর একটা মন ছিল তানজিলার৷ গোছানো-পরিপাটি৷ রফিকের ছোট ফুপুর মেয়ে তানজিলা৷ জন্মের পর মা মারা যায়৷ বাবা দ্বিতীয়বার বিয়ে করলে রফিকের বাবা তানজিলাকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন৷ সেই থেকে তানজিলা মামার বাড়িতে; রফিকের আপন বোন হয়ে থাকতে থাকে৷
কলেজ থেকে ফিরে এসে আমার এলোমেলো ঘর পরিপাটি পাবার পেছনে কার কারসাজি থাকতে পারে— রহস্য যেদিন উন্মোচিত হয়, সেদিন থেকেই আমার প্রতি তানজিলার যে একটা গোপন মোহ তা আমার উপলব্ধে আসতে শুরু করে৷ তানজিলার অবাক চাহনি, দুষ্টুমি মেশানো ভ্রুকুটি, গ্রীবা দুলিয়ে নিশ্চুপ হেঁটে যাবার ভঙ্গি সবই আমাকে যে সে তীব্রভাবে ভালোবাসে সে কথা বলে দিতে থাকে৷ কিন্তু আমি তার সে রোদ্দুর ছড়ানো হাসির জবাবে এক চিলতে হাসিই কেবল বিনিময় দিতে পারি৷ এর বেশি সাহস হয় না৷ আমার আটপৌরে একঘেয়ে জীবন আমাকে তানজিলার উন্মাতাল ভালোবাসার সমুদ্রে ঝাপিয়ে পড়ার মতো অতোটা উৎসাহী করে না৷ কিন্তু রফিক আজ কী বললো! তানজিলা এখনও আমাকে কামনা করে! তার জীবনে আজও সে আমার উপস্থিতি প্রত্যাশী! এতোটা আমি ভাবিনি৷
কন্ডাক্টারের চিৎকারে বুঝে নিই— গন্তব্য আর বেশি নেই৷ পৌঁছে গেছি আমরা৷ দেখি রফিক এখনও সোৎসাহে ওর গ্রামের গল্প বলে যাচ্ছে৷ তাল কেটে যাওয়াতে ধরতে পারলাম না ও কার ফেঁসে যাওয়ার কথা বলছে৷ আমি রফিককে থামিয়ে বললাম— “নাম রফিক, চলে এসেছি আমরা৷”
