আজ ক’দিন থেকে মনটা ভালো নেই মৃদুলের৷
এটা অবশ্য, খুব একটা বড় খবর হলো না৷ ওর আশে-পাশে যারা রয়েছে এতে করে তাদের যে কিছু আসছে-যাচ্ছে, তাও না৷ যে যার গতিতে চলছে৷ কারও একটুখানি বিরাম নেই৷ মৃদুলের দিকে ফিরে তাকাবে, ওর মন খারাপের কারণ খুঁজতে যাবে কার ঝুলিতে আছে এতখানি অখণ্ড অবসর? সবাই বরং বেশ ফুরফুরে মেজাজেই আছে৷ শুধু মৃদুলের মনটা ভালো নেই৷
অন্য দিনের মত শরীর ম্যাজম্যাজ করছে— তা নয়৷ প্রচণ্ড মাথা ধরেছে— এমনও নয়৷ কিছুই নয়৷ তবু সে দুনিয়ার ওপর চটে আছে৷ ভ্রু কুঁচকে আছে৷ ওর বর্তমান অবস্থাকে এক কথায় বলা যায়, সে ভীষণ রেগে আছে৷ শুধু রেগে আছে বললে ভুল হবে৷ ওর বুকের ভেতরটাও জ্বলে যাচ্ছে৷ ক্ষণে ক্ষণে মনটা হুঁ হুঁ করে উঠছে৷ খরার দিনের শস্যহীন মাঠের মতো ওর মনটা ধূসর ঝাপসা হয়ে আছে৷ শরতের এমন উজ্জ্বল সকালেও গ্রামের প্রান্তে খানবাড়ির শ্যাওলা ওঠা বাউন্ডারি-ওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে আছে মৃদুল৷ মৃদুলের মনটা আজ সত্যিই ভালো নেই৷
শরতের এই উজ্জ্বল ঘোরলাগা সকালে ওর মনটা কেন খারাপ, তা শুধু সেই জানে৷ প্রসন্ন শীত শীত বাতাস বইছে৷ রোদ যেন সোনা, মাঠভর্তি সবুজ ধানের শীষের ওপর কাঁচা রোদের সোনা৷ কিন্তু সবই তার কাছে বিস্বাদ লাগছে৷ কিছুই মন ধরছে না৷ পৃথিবীটাই মৃদুলের কাছে তেতো মনে হচ্ছে৷
মৃদুলকে এমন করে বসে থাকতে দেখে একদমই কেউ কাছে আসেনি, কিছু জানতে চায় নি— ব্যাপারটা পুরোপুরি এমন নয়৷ দু’-চারজন মুরুব্বী গোছের পরিচিতজনেরা কৌতূহল নিবৃত্ত করতে না পেরে তো বলেই ফেলেছে—
কী বাবা, এমন করে বসে আছ যে?
মৃদুল স্বভাবতই মুখ হাসি হাসি রেখে জবাব দিয়েছে—
না, দাদু! এমনিই…
অনেক প্রশ্নকর্তা আবার এতটুকুতে সন্তুষ্ট হতে পারে না৷ তারা আরও জানতে চায়—
এমনিই কিরে…এই সাত সকালে এমনিতেই কেউ কি আর এভাবে মন ভার করে বসে থাকে রে…?
মৃদল নিরুত্তর৷ ঈঙ্গিতে বুঝিয়ে দেয়— কথা বাড়াতে চায় না সে৷ মৃদুলের এটা এক সমস্যা৷ মন খুব বেশি খারাপ হলে, রাগটা বেড়ে চলে৷ আর মৃদুলের রাগটা একটু বিপজ্জনকই বটে৷ হিতাকাঙ্খী-প্রশ্নকর্তা আরও কিচু জিজ্ঞাসা করলে সে ক্ষেপে উঠতো হয়তো৷ ভাগ্য ভালো, প্রশ্নকর্তা আর সামনে এগোয় না৷
শরতের এই উজ্জ্বল ঘোরলাগা সকালে ওর মনটা কেন খারাপ, তা শুধু সেই জানে৷ প্রসন্ন শীত শীত বাতাস বইছে৷ রোদ যেন সোনা, মাঠভর্তি সবুজ ধানের শীষের ওপর কাঁচা রোদের সোনা৷ কিন্তু সবই তার কাছে বিস্বাদ লাগছে৷ কিছুই মন ধরছে না৷ পৃথিবীটাই মৃদুলের কাছে তেতো মনে হচ্ছে৷
পলেস্তরা খসে পড়া পড়ো পড়ো দেয়াল থেকে এক লাফে মাটিতে নেমে আসে মৃদুল৷ হঠাৎই যেন দু’চোখে দপ করে আগুন জ্বলে উঠলো দু’চোখে৷ শক্ত হয়ে উঠেছে চোয়াল৷ দু’ হাতের আঙুলগুলো নিজের হাতেই পিষে ফেলতে চাইছে যেন৷
তবে কি কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছল আমাদের মৃদুল!
কি হতে পারে মৃদুলের এমন দৃঢ়তর সংকল্প?
লাল ইট বিছানো পথটি মাড়িয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের পিচঢালা কালো সড়কটির ওপর এসে দাঁড়ালো মৃদুল৷ এরপর সোজা নেমে পড়লো উত্তরের মাঠের দিকে৷ রোদে পোড়া সোনালি ধান, নতুন চাষ দেওয়া এঁটেল মাটির আলগা ভূমি সব পেছনে ফেলে জমির আল ধরে ছুটতে থাকে মৃদুল৷ এটু দূরে— মৃৃদুল যেদিকে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছিল, সে রাস্তাতেই— ঝোপের পাশে একটা শেয়াল চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিল৷ হয়ত মধ্যাহ্নের ক্লান্তিতে চূর হয়ে গা জুড়াতে বসেছে এ গাছের আড়ালে৷ মৃদুল হুড়মুড় করে প্রায় তার ওপর গিয়ে পড়তে বসেছিল৷ শেয়ালটা দৌঁড়ে পালালো৷ পালানোর সময় ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিল মৃদুলকে৷ বোধহয় ভীষণ বিরক্ত হয়েছে ওর ওপর৷ এখন সময় নেই৷ অন্য সময় হলে ওর বিরক্তি ঠিকই পুষিয়ে দিত মৃদুল৷ তবু খানিক্ষণ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়াতে হলো মৃদুলকে৷
মৃদুলের এ ছুটোছুটি নিরুদ্দেশের উদ্দেশে নয়৷ ও গন্তব্যের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে৷ একটু একটু করে লম্বা একটা কৃষ্ঞকায় সরলরেখা নজরে আসতে লাগলো ওর৷ ও…ই…তো, ওইতো রেল লাইন৷ মৃদুল সমুখে সমান্তরাল রেল লাইন পরিস্কার দেখতে পেল, পেছনে ঝাপসা ধূসর মাঠ৷ আর রেল লাইনটা পেরুলেই বিল৷ জলডাকাতিয়া৷ যেন দিগন্ত ছেঁড়া বিশাল কোন জলধি৷ কিছুটা ঘাবড়ে গেল মৃদুল৷ বিলের ওপার দেখা যায় না৷ মাঝখানে শুধু ধোঁয়াশা মনে হয়৷ বিলের মধ্যিখানে কোথাও কোথাও বালিহাঁসের হাট বসেছে৷ ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস৷
শোঁ শোঁ করে একটা শব্দ হলো মাথার ওপর৷ মৃদুল চোখ জোড়া রোদের আড়াল করে মেঘের ওপারে চেয়ে দেখল৷ বালিহাঁসের মোটামুটি বিরাট একটা দল খুব কায়দা করে উড়ে যাচ্ছে৷ ওদের পা খুব কায়দা করে পেছনের দিকে ফেরানো৷ গলা বাড়িয়ে দেওয়া সামনের দিকে৷ রোদে ঝলকাচ্ছে ওদের কালচে ডানা৷ গলার কাছে নস্যি রঙ যেন সোনালি আভা ছড়াচ্ছে৷ হঠাৎ সাঁ করে ঘুরে একটা বড় ত্রিভূজের আকার নিয়ে বালিহাঁসের দলটা বিলের দিকে ফিরল
গোধূলির বিষণ্ন সূর্যটা একরাশ বিষাদ ছড়িয়ে দিয়ে চুপিসারে ডুব দেয় দিগন্তের ওপারে৷
এতদূর দৌঁড়ে এসে ক্লান্ত অবসন্ন মৃদুল রেল লাইনের নিচে জমির আলে বসে পড়ে৷ মুখের মধ্যে জিভটা নড়ে ওঠে একবার৷ একেবারেই শুকনো৷ আল জিভ পর্যন্ত কাঠ হয়ে আছে যেন৷
পানির প্রচণ্ড তেষ্টা অনুভব করে মৃদুল৷ অবিচ্ছেদ্যভাবেই মনে পড়ে যায় বাড়ির কথা৷ মায়ের কথা৷ বালিহাঁসের মতো গলা উঁচিয়ে চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে নিল একবার৷ ঠিক কোন দিকে ওদের বাড়ি ঠাহর করতে পারে না৷ হঠাৎই দুঃখী হয়ে ওঠে মৃদুল৷ এক মুহূর্ত চিন্তা করে নিল, সে যা করতে যাচ্ছে ঠিক হচ্ছে তো! অকস্মাৎ ভাবনাগুলো দলছুট হয়ে এসে গ্রাস করে ফেলে মৃদুলকে৷ তবে সেটা ক্ষণিকের জন্যই৷ পুরোনো ইচ্ছেটা দাঁত বের করে আবারও মৃদুলের সামনে এসে দাঁড়ায়৷ অথচ সে প্রচণ্ডভাবে চাচ্ছে ইচ্ছেটা ভুলে থাকতে৷ কিন্তু সর্বনাশী ইচ্ছেটা আরও ভয়ঙ্করভাবে ক্ষেপে ওঠে৷ মরে যেতে ইচ্ছে করে মৃদুলের৷
আজ সকাল থেকেই ওর ভীষণ মরে যেতে ইচ্ছে করছে৷
আজই যে প্রথম, তা নয়৷ আরও একবার মরে যেতে ইচ্ছে হয়েছিল মৃদুলের৷ এইতো ক’দিন আগে৷ মৃদুল মনে করলো ঘটনাটি৷ স্কুলের নতুন বছরের প্রথম দিন৷ মনজুর স্যার প্রথম ক্লাসে এসেই বললেন—
তোদের তো একজন ক্লাস ক্যাপ্টেন লাগবে রে, নাম বলতো, কে হলে ভাল হয়?
সবাই মৃদুলের নাম বললো৷ স্যার ঘোষণা দেয়ার ভঙ্গিতে হাসি হাসি মুখ করে বললেন—
এ বছর ক্লাস সেভেনের ক্যাপ্টেন আমাদের মৃদুল৷ তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা ক্লাস ক্যাপ্টেন হিসেবে তার উপর অর্পিত যাবতীয় দায়িত্ব সে নিষ্ঠার সাথে পালন করবে৷
স্যারের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ব্যাপারটা স্যার যথেষ্ট উপভোগ করছেন৷ স্যার তার কর্মকাণ্ডে ক্ষান্ত দিলেন না৷ মৃদুলকে সবার সামনে ডাকলেন৷ যথারীতি উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে বললেন—
এখন শপথ পর্ব৷ মৃদুল এখন শপথ গ্রহণ করবে৷ তার আগে দেখি, আমাদের সিদ্ধান্তে কারও কোনও ভিন্নমত আছে কি না! ‘ডেমোক্রেসি’র চর্চা স্কুল থেকেই হওয়া উচিত৷ কি, কারও আপত্তি আছে?
এক কোণা থেকে আনোয়ার উঠে দাঁড়ালো৷
আমার আপত্তি আছে, স্যার৷
স্যার ভাবতেও পারেননি, কেউ আপত্তি করতে পারে৷ স্যার তো কেবল ফরম্যালিটি হিসেবে কথাটা তুলেছিলেন৷ আগে বুঝতে পারলে এ ঝুঁকি নিতেন না৷ মৃদুলকে তার বেশ পছন্দ৷
স্যার ঘরঘর স্বরে বললেন—
কিরে আনোয়ার, তোর আবার কী হলো?
আনোয়ার স্যার সামনেই তেড়ে এসে মৃদুলকে লক্ষ্য করে বলে—
খুব যে ক্লাস ক্যাপ্টেন হবার বায়না ধরেছিস, সে মুখ আছে তোর? জানিস তোর বাবা কোথায়?
মৃদুলের বেশ সময় লাগে বুঝে উঠতে— আনোয়ার এসব কী বলছে? ও আবার বায়না ধরলো কখন? তা ছাড়া এসবের মধ্যে বাবার কথায় বা আসছে কেন! তবে ঘাবড়ায় না মৃদুল৷ ছোট বয়স থেকে মায়ের কাছে যেমন শুনেছে তেমনই উত্তর দেয়—
ঢাকায়!
ঢাকায়, তো আসে না কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর তো মৃদুল নিজেও খুঁজে ফেরে৷ কখনও মায়ের কাছে, কখনওবা দাদুর কাছে৷ মা ওকে বলেছে, বাবা আসবে৷
মায়ের ওপর মৃদুলের খুব আস্থা৷ মৃদুল গাল ফুলিয়ে, বুকের মধ্যে জোরে শ্বাস টেনে গর্বের সঙ্গে বলে—
আসবে৷
আর আসতে হচ্ছে না!
কণ্ঠে বেশ খানিকটা ঝাঁঝ মিশিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় মৃদুল—
কেন?
আনোয়ারের কথা বলার ভঙ্গি আরও উদ্ধত হয়৷ ঠোঁটের কোণে বিদ্রুপের একটা হাসি ঝুলিয়ে বলে—
আসবে যে, সে মুখ আছে তোর বাবার! আসলে গ্রামে মুখ দেখাবে কী করে?
মৃদুল ভাবনায় পড়ে যায়, কী বলতে চায় আনোয়ার! নিজেকে স্বাভাবিক রেখে খুব ছোট্ট করে বলে মৃদুল—
কেন?
তোর বাবা খারাপ পাড়ার একটা মাগি নিয়ে ভেগেছে৷
এই প্রথম স্যারের সামনে একটা বেয়াদবি করে বসলো মৃদুল৷ ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দিল আনোয়ারের গালে৷
সেদিন স্কুল ছুটির পর বিকেলে বাসায় ফেরে না মৃদুল৷ বারবার কানে ভেসে আসা আনোয়ারের কথাগুলো ভাবতে থাকে৷ কিছুতেই তাড়াতে পারে না মন থেকে৷ শেলের মতো এসে বিঁধতে থাকে যেন বুকের মধ্যিখানে৷ ‘তুই একটা বেজন্মা৷ একটা বেজন্মাকে আমাদের ক্লাস ক্যাপ্টেন মেনে নিতে পারি না আমরা৷’ গোধূলির বিষণ্ন সূর্যটা একরাশ বিষাদ ছড়িয়ে দিয়ে চুপিসারে ডুব দেয় দিগন্তের ওপারে৷
সন্ধ্যা নামলে বাসায় ফিরে কারও সাথে কথা বলে না মৃদুল৷ হাত-মুখ না ধুয়েই পড়ার টেবিলে বসে যায়৷ কিসের আর পড়া! একটা অক্ষরও পড়তে পারে না৷ বই খুলে সামনের দেয়ালে আঁছড়ে পড়া ছায়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকেই সময় পার করলো কেবল৷ মা ও কথা বলতে গেলেন না৷ ভাবলেন খোকার মন খারাপ করেছে৷ রাতের অন্ধকার একটু গাঢ় হলে আলো নিবিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লো মৃদুল৷ একবার ভাবলো জিজ্ঞাসা করবে, ‘মা! বাবা কোথায়?’ কিন্তু না, মৃদুল জিজ্ঞাসা করে না৷ তার কিছুই জানবার নেই৷ সে তো জানে, বাবা কোথায়৷ অই যে আনোয়ার সংবাদ দিল! ওই সেদিনই প্রয়ান্ধকার ঘরে বিছানায় শুয়ে মৃদুলের প্রথম ইচ্ছে হয়, সে মরে যাবে৷
সেই একবার৷
অনেকদিন পর আজ সকাল থেকেই ওর আবার মরে যেতে ইচ্ছে করছে৷ কাল রাতে— মা ঘরে যখন ঘুমুতে গেছে মৃদুল— মা বলেন—
খোকন, আজ একটু অথৈ’র সঙ্গে থাকো৷
মৃদুল অবাক হয়৷
কেন, মা? আমি নিজের বাড়ি রেখে আরেকজনের বাড়িতে শু’তে যাব কেন?
মা ধমকে উঠলেন৷
অন্যের বাড়ি বলছ কেন, অথৈ তোমার ভাই৷ তোমার আঙ্কেল-আন্টি ওদের এক বন্ধুর বিয়েতে গেছে৷ ফিরতে নাকি রাত হবে৷ রাতে ওর একা ঘুমুতে ভয় করে৷ আমি ওকে তোমার কথা বলে রেখেছি, সে তোমার অপেক্ষায় থাকবে৷
সে রাত মৃদুল থাকলো অথৈ’র সাথে৷ কিন্তু রাতভর দু’চোখের পাতা এক করতে পারলো না৷ কি করে পারবে? বাড়ির বাইরে এর থেকেছে নাকি কখনও! তাও আবার মা’কে ছাড়া৷
খুব ভোরে মৃদুল বাড়ির উটোনে এসে দাঁড়ালো৷ আকাশ তখনও ফর্সা হয়নি৷ কলতলায় একটা দাঁড়কাক কেবলই হেড়ে গলায় ডেকে ওঠার প্রস্তুতি সারছে৷ সাদা বিড়ালটা তিড়িং করে লাফ দিয়ে বারান্দা দিয়ে দৌঁড়ে পালাচ্ছে৷ রান্নাঘরের পাশেই দাদুর ঘর৷ অসুস্থ দাদু হা করে, নিজের দু’ পাটি দাঁত তারচে’ বড় হা করে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে৷ পেয়ারা গাছে একজোড়া টুনটুনি টুনটুন করে নিজেদের মধ্যে কি যেন এক গোপন আলাপ সেরে নিচ্ছে৷ এমন সময় মৃদুল নিজের ঘরে এলো৷ ওর যায়গায়— যেখানটাতে মায়ের পাশে মৃদুল গুটিশুটি হয়ে পড়ে থাকে— একজন ফর্সা লোক৷ মায়ের ঘন কালো চুলগুলো এলোমেলো৷ বুকের ওপরে কাপড়টাও ঠিক যায়গাতে নেই৷ চাপা কলার মতো মায়ের লম্বা লম্বা আঙুলগুলো লোকটার কোকড়ানো চুলের ভেতর বিলি কাটছে৷
মায়ের চোখ পড়ে যায় মৃদুলের দিকে৷ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নিচু করে ফেলেন তিনি৷ মুখ লুকোবার হাস্যকর চেষ্টা৷
কলতলার দাঁড়কাকটা বিদঘুটে কা কা চিৎকার জুড়ে দেয় তারস্বরে৷ ফুঁড়ুৎ করে উড়াল দেয় পেয়ারা গাছের ডালে আলাপরত টুনটুনি৷ পুবের আকাশটাও যেন ফর্সা হতে হতে লজ্জায়, শরমে শেষ পর্যন্ত আবারও আঁধারে আচ্ছন্ন করে ফেলে পৃথিবী৷
মৃদুল অনুভব করে ওর তেষ্টা বেড়ে চলেছে৷ তীব্র হয়ে উঠছে মৃত্যুর আমিয় সুধা পান করার প্রবল পিপাসা৷ মৃদুল রেল লাইনের দিকে ফিরে তাকালো৷ ও দেখতে পেল জলডাকাতিয়ার সবগুলো বালিহাঁস বিলের বুক থেকে উঠে এসে রেল লাইনের ওপর তাদের মেলা বসিয়েছে৷ মৃদুল উঠে দাঁড়ালো৷ সময়ের আর অর্থহীন অপচয় করতে চায় না৷ অন্তত একটা বালিহাঁস ও দু’হাতে ছুঁয়ে দেখতে চায়৷
ঠিক এ সময়টায় দুপুর তিনটার নিলমণি এক্সপ্রেস রেল লাইনের ওপর দিয়ে দৈত্যের মতো এসে ঝড়ের গতিতে ছুটে গেল৷ সাথে সাথে এক ঝাঁক বালিহাঁস রেল লাইন ছেঁড়ে ডানা মেলে আকাশে৷ রেল লাইন, ধানের ক্ষেত, নতুন চাষ দেওয়া ফসলি জমি, বিল ডাকাতিয়ার থৈ থৈ নীল জলরাশি সব পেছনে ফেলে হারিয়ে যায় দিগন্ত ছিঁড়ে৷ দূরে৷ বহুদূরে৷ শুভ্র মেঘের ওপারে৷
