আমিই কাশ্মীর৷ যাকে আপনারা পৃথিবীর স্বর্গ বলে স্মরণ করেন৷
আমি তো ভুলিনি সেই হীরণ্ময় দিনটির কথা যেদিন আপনারা প্রথম কাশ্মীরের কোন উপত্যকায় প্রবেশ করলেন আর অজান্তেই আপনাদের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো—“আমরা স্বপ্ন দেখছি না তো! বিশ্বাসই হতে চায় না৷ কোনও ভূখণ্ড এত সুন্দর হতে পারে! দুনিয়াতে কোথাও যদি স্বর্গ থেকে থাকে তবে তা এখানেই, তবে তা এখানেই!”
কী আমির, কী ফকীর, কী রাজা, কী প্রজা, কী মুসলিম, আর কী হিন্দু—এমন কাউকে দেখিনি যে আমার কোন উপত্যাকা দিয়ে হেঁটে গেছে কিন্তু আমার সৌন্দর্যের তা’রীফ করেনি৷
আমার বুকে এমন কোন্ সে হ্রদ আছে যাকে নিয়ে কোন কবি পংক্তি রচনা করেনি! কোন এমন ঝিল আছে যাকে নিয়ে গেয়ে ওঠেনি গান কোন শিল্পী!
আপনাদের তো গুলমার্গের কথা অবশ্যই স্মরণ আছে, যেখানে ‘কেবল কারে’ চড়ে আমার অপরূপ ‘মানযার’ আপনারা উপভোগ করেছেন আর তৃপ্ত হয়েছেন এই ভেবে— “পৃথিবীর সর্ব্বোচ্চ স্থানে রয়েছি আমরা৷”
পেহেলগাঁয়ের কথা আপনারা কীভাবে ভুলে যাবেন! যেখানে দুরুদুরু বুকে আপনারা ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়েছেন; ছুটে চলেছেন পাহাড় পেরিয়ে পাহাড়ের শৃঙ্গে৷ কখনও আপনাদের মনে হয়েছে— এই বুঝি পড়ে যাবেন ঘোড়ার পিঠ থেকে! কখনও শঙ্কা জেগেছে— এখনই বোধয় ঘোড়া আপনাকে নিয়ে লুটিয়ে পড়বে শুভ্র শীতল বরফের বুকে! কিন্তু এমন হয়নি৷ আমার সন্তানদের মতো প্রাণীগুলোও যে এখানে ‘মেহমান নওয়াজ’!
চলুন আপনাদের আমি আরও কিছু মনে করিয়ে দিই৷ ওই হাউস বোটের কথা কি আপনাদের মনে পড়ে! কী বিমলানন্দে সময় কাটাতেন আপনারা এইসব নান্দনিক হাউসবোটে! হাউসবোটের জানালা দিয়ে আপনারা ঝিলামের দিকে তাকিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যেতেন৷ চোখের পলক পড়তো না কারও৷ পৃথিবীর সাথে আর যোগাযোগ থাকতো না আপনাদের৷ ফের যখন আপনাদের এমন তন্ময়তার ভেতর পেজা তুলোর মতোন তুষার নেমে আসতো মেঘের দেশ থেকে আপনারা নেমে পড়তেন সড়কে৷ শিশুর আনন্দ নিয়ে কোলে তুলে নিতেন হাওয়াই মিঠাইয়ের মতন শুভ্র তুষার৷ লাদাখের চারপাশে ঠাঁই দাড়িয়ে থাকা চিনার বৃক্ষগুলো যখন তুষারে ঢেকে যেতো আপনারা কেমন অবাক বিস্ময়ে সেদিকে চেয়ে তাকতেন৷ সে দৃশ্যগুলো আজও আমার চোখে অমলিন৷
আমার সৌন্দর্যবর্ধন তো সব কালেই হয়েছে৷ প্রত্যেক রাজা-মহারাজা-সুলতান আমাকে সাজিয়েজেন তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে৷ ইংরেজরা যখন ভারতের ক্ষমতা দখল করে নিল তখন তো আমি ভয়েই খুন৷ ভেবেছিলাম এবার বোধয় আমার রক্ষা হবে না৷ ভারতের মতো বিশাল সাম্রাজ্য যারা শুষে নিচ্ছে আমাকে কি ছাড়বে! নিশ্চয় নিশ্চহ্ন করে দিবে আমাকে৷ মুছে দিবে দুনিয়ার মানচিত্র থেকে৷ কিন্তু আমার শঙ্কা ভুল প্রমাণিত হলো৷ তারাও আমার রূপের প্রেমে পড়ে গেল৷ আমাকে সাজাতে তারাও তাদের মননের সবটুকু সৌন্দর্যবোধ ঢেলে দিল৷ এমনই আমার মুগ্ধতা! শত্রুও আমার প্রেমে মুগ্ধ হতে বাধ্য৷
আপনাদের একটা মনের কথা বলি— সেদিন আমার খুশির অন্ত ছিল না, যেদিন জানতে পেলাম ইংরেজরা ভারত ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে৷ ভারতভূমি স্বাধীন হচ্ছে৷ ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল আমার৷ জানেন, কেন এত আনন্দ ছিল আমার চোখে! কারণ, আমি ভেবেছিলাম— আমার অধিকার এখন আমার আপন লোকেদের হাতে যাবে! তারা হৃদয় নিংড়ে আমাকে শুশোভিত করে তুলবে৷ ঝিলাম আরও মিষ্টি করে হেসে উঠবে৷ নিশাত ও শালিমার বাগের ফুল কলিরা সুবাস ছড়াবে পূর্বের চেয়েও তীব্রভাবে৷ লাদাখের অলিগলি মুখর হবে শিশু কিশোরের কল কাকলিতে৷ ঝর্ণার রিনিরিনি কলতান অপূর্ব সুর লহরি নিয়ে গুঞ্জে উঠবে আরও মাদকতা নিয়ে৷ পাখিদের কিচির মিচিরে মুখরিত হবে চিনার বন৷
কিন্তু আমার মোহ ভাঙতে সময় লাগে না৷ ইংরেজ যেদিন বিদায় নিল সেদিন থেকেই আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ শুরু হলো৷ অকস্মাৎ এক ঘূর্ণি এলো আমার জীবনে৷ যে ঘূর্ণিঝড় কিশোরের কোলাহল কেড়ে নিল, পাখিদের গান ভুলিয়ে দিল, বাবার ভরসা মিটিয়ে দিল, মায়েদের মুখের হাসি মুছে দিয়ে গেল৷ ছিনিয়ে নিল কত শত যুবকের স্বপ্ন!
তারপর তো ঝিলামের বুকে কত জল গড়ালো৷ কত পাতা ঝরে গেল চিনারের গা থেকে! এদিকে বাড়তে থাকলো আমার বুকের ক্ষত৷
আপনারা এই সময়ে যদি কাশ্মীরে আসেন হয়তবা দেখবেন আমার বুকে বয়ে চলা খরস্রোতা কোন পাহাড়ি নদীর চলাচল থেমে পড়েনি৷ বাগান থেকে খসে পড়েনি কোন হাস্যজ্জ্বল টিউলিপ৷ অপার রহস্য নিয়ে দাড়িয়ে থাকা কাশ্মীর ভ্যালীর কোনো পর্বতের সৌন্দর্যেও অকস্মাৎ পতন ঘটেনি৷ লাদাখের কোনো পর্বত থেকে খসে পড়েনি কোনো বিশালাকায় বরফখণ্ড৷
কিন্তু কারও হৃদয় থাকলে উবলব্ধ করে উঠবেন— থমকে গেছে আমার জীবন৷ আমার বুকের জমীনে হাজার বছর কাল কাটাচ্ছে যে মানুষগুলো, স্তব্ধ হয়ে গেছে তাদের সব সুখ, সব সপ্ন৷
আপনারা রাঙা আপেল আর টসটসে আঙুরে ছাওয়া কাশ্মীর দেখেছেন৷ ঝিলামের বুকে নেমে আসা সোনালী সুর্যের ঝিলিমিলি দেখেছেন৷ চিনার বৃক্ষের পাতায় পাতায় শুনেছেন নূপুরের ধ্বনি৷ গুলমার্গ, পেহেলগাঁম আর সোনমার্গের তুষার ঢাকা শৃঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়েছেন৷ জাফরান ফুলের বর্ণে-গন্ধে ফুসফুস ভরেছেন নির্মল বাতাসে৷ ডাল ও নাগিন হ্রদের তীরে ছুটিয়েছেন খুশির হল্লা৷ দেখেছেন কিশোরী-তরুণীদের ভুবন ভোলানো হাসি৷ উপভোগ করেছেন শিশু-কিশোর-নওজোয়ানদের নির্মল কলকাকলি৷
তবে এবার আপনারা কাশ্মীরে এলে কিছু নতুন দৃশ্যের দেখা পাবেন ৷ কিছু নতুন মানুষের সাথে আপনাদের পরিচয় হতে পারে৷ যাদের কারও পিতা বুলেটের আঘাতে জখমি হয়ে ঘরে পড়ে আছেন৷ কিছু মায়ের দেখা পেয়ে যেতে পারেন৷ সন্তানের ফেরার মিথ্যা আশা বুকে নিয়ে যারা শুন্যে চেয়ে থাকেন৷ পরিচয় হতে পারে গুরিহাকার সেই বধূটির সাথে যে কোলের বাচ্চাকে দুধ পান করাচ্ছিল৷ সেই ঠিক দ্বিপ্রহরে রাস্তা থেকে এক জোড়া বুট উঠে এসে দাড়িয়েছিল তার সমুখে ৷ বন্দুকের নল গিয়ে ঠেকেছিল তার অবুঝ শিশুর বুকে৷ শেষমেষ কোলের শিশুকে বাঁচাবার মিথ্যা আশায় সম্ভ্রম বিলিয়ে দিয়েছিল যে৷ এবার যদি পুলওয়ামার আহারবল জলপ্রপাতে কান পাতেন এখনও শুনতে পাবেন সেই অসহায় মায়ের আর্তচিৎকার৷
কুনান ও পোশপোরার পথে ঘুরতে-ফিরতে আপনাদের দেখা হয়ে যেতে পারে সেই বত্রিশ নারীর কারও স্বজনের সাথে; গ্রাম থেকে যারা একদিন উধাও হয়ে গিয়েছিল৷ দেখবেন— কারও দৃষ্টিহীন বাবা কাঁদছেন৷ কারও স্বামী পাগলের মতন সহধর্মীনিকে খুঁজে ফিরছেন৷ কারওবা সন্তানের হাত-পা ছোঁড়া কান্না থামানো যাচ্ছে না৷
আরও দেখবেন জমীনে পড়ে আছে কোন কাশ্মীরি যুবকের নিথর দেহ৷ একটু ভালো করে চোখ পাতলে তার বিক্ষত শরীরে করাতের এবড়োথেবড়ো চিহ্নও চোখে পড়ে যাবে আপনাদের৷
শ্রীনগরের পথে-প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বোমার আওয়াজে চমকে উঠতে পারেন৷ লাদাখের ওলিতে-গলিতে কিশোরের কলকাকলি খুঁজতে গিয়ে বুলেটের মুখে পড়ে যেতে পারেন৷ তবে কি ভাবছেন! আর আসছেন না কাশ্মীর?
ঝিলামের রৌদ্রকোরোজ্জ্বল জলস্রোত নয়, আমার বুকে বয়ে যাওয়া রক্তস্রোত দেখবার জন্য আরো একবার কাশ্মীরে আপনাদের নিমন্ত্রণ৷ চিনার বৃক্ষের পাতায় রিনরিনি নূপুরের ধ্বনি শুনতে নয়; অত্যাচারীর বুলেটের গর্জন থামিয়ে দেবার জন্য আরও একবার আপনাদের আসতে হবে আমার কাছে৷ কিশোরীর কাঁচভাঙা হাসির জন্য নয়; তার নিষ্পাপ সম্ভ্রম রক্ষার জন্য আপনাদের কাশ্মীরে আসতে বলছি, একটিবার৷ আপনারা আসবেন তো!
শুনুন, আমি কাশ্মীর বলছি৷ যাকে আপনারা পৃথিবীর স্বর্গ বলে স্মরণ করে থাকেন৷
ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরের সৌজন্যে
