প্রতিচিন্তার চলতি সংখ্যাটা (জানুয়ারি-জুন, ২০২১) কি আপনারা দেখেছেন!
এ সংখ্যাতে আলতাফ পারভেজের দারুন একটা নিবন্ধ ছাপা হয়েছে। এ নিবন্ধে তিনি মূলত কবি আল মাহমুদের বিখ্যাত কবিতা ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র ক্রিটিক করেছেন। এবং তা সামনে রেখে ইতিহাসের কিছু বয়ান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।
বখতিয়ারের ঘোড়ার এই ক্রিটিক তিনি কী বাক্য দ্বারা শুরু করেছেন লক্ষ্য করুন। আলতাফ পারভেজ বলছেন, কিন্তু ইতিহাস-চৈতন্যের দিক থেকে তা (কবিতাটি) কোনো ভুল বার্তা দেয় কি না, সে প্রশ্ন তোলা যায়। ইতিহাসস্পর্শী কবিতা সে প্রশ্ন এড়াতে পারে না।
আলতাফ পারভেজ বলতে চাচ্ছেন, যেহেতু কবিতাতে ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত আছে ফলে সে ইঙ্গিত যথার্থ কি না–সে প্রশ্ন তোলা উচিত। এবং সে প্রশ্ন তুলেই তিনি পরবর্তী বাইশ পাতার আলোচনা হাজির করেছেন।
এখন আমি যা বলতে চাচ্ছি–এই যে কবিতায় ইতিহাসের ভুল বার্তার (নিবন্ধকারের মতে) কথা বলে কবিতার ক্রিটিক করছেন আলতাফ পারভেজ তাতে করে তাকে কিন্তু কেউ বলছেন না, বলছে না বা বলবে না (অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি) যে, তিনি কবিতার মতো খালেস একটা সাহিত্যকে বিচার করছেন ইতিহাসের শুদ্ধাশুদ্ধি দিয়ে। কেউ বলছে না যে, তিনি কবিতায় উল্লেখিত ইতিহাসের কাটাচেরা করে ভুল করছেন। কবিতা বা ফিকশনে এসব হয় না। ইতিহাস ইতিহাসের বইয়ে থাকবে। তিনি ফিকশনে তা খুঁজতে এসে এবং অতঃপর তা না পেয়ে কবিতার কাটাচেরা করতে পারেন না।
কিন্তু আমরা যখন উপন্যাসে কোনো ঐতিহাসিক তথ্যের ভুলের দিকে ইঙ্গিত করি, ঐতিহাসিক কোনো উপন্যাসে ভয়াবহ রকমের বিভ্রাটের কথা তুলে ধরি তখন সবাই রে রে করে তেড়ে আসে। সব গেল সব গেল রে–অবস্থা। আপত্তি তোলা হয়, উপন্যাসে আবার ঐতিহাসিক তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই করতে হবে কেন! ফিকশনের আবার পোস্টমর্টেম কী!
এরপরেই আলতাফ পারভেজ বলছেন, কবিতা বহুকাল ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের অন্যতম উৎস। মানে কবিতার মধ্য দিয়ে পরবর্তী প্রজন্ম ইতিহাস সচেতন হবে। খুঁজে নেবে ইতিহাসের বয়ান। বিশ্বাস করি, তিনি কবিতার ক্রিটিক করছেন বিধায় কবিতার কথা বলছেন। নতুবা উপন্যাস কি ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের উৎস নয়! তাহলে আমরা ঐতিহাসিক উপন্যাস কেন লিখি! কেন পড়ি!
এ তো গেল ঐতিহাসিক উপন্যাসের কথা।
কবিতাতেই যদি আসি তাহলে এই সেদিন এক কবির ‘কবিতা’ নিয়ে কী ঘটে গেল তা তো এখনও চোখের পর্দা থেকে সরে যায়নি। কবিতায় ভুল ঐতিহাসিক তথ্যের ক্রিটিক যদি করা যায় তবে ভুল কুরআনিক অনুবাদের ক্রিটিক কেন নয়!
অথচ সেই ক্রিটিক করেই কতজনকে পোপতন্ত্রের তকমা গায়ে লাগাতে হলো।
যে বন্ধুরা সমালোচনাকে ‘পোপতনন্ত্রের উল্লম্ফন’ বা এ গালিকে সমর্থন করে ‘এ ক্ষেত্রে পোপতন্ত্র বলা সহী’ বলেছেন তাদের বলবো, মনুষ্য রচনার কোনো কিছুই ক্রিটিক ও সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। সমালোচনার জবাবে সমালোচনায় করা হোক।
আমি আবারও এই অবকাশে যে কোনো পক্ষের যে কোনো ধরণের লেবেল সাঁটার বিরোধিতা জানিয়ে গেলাম।
আমাদের ভালো হোক।
