সেদিক থেকে কল্যাণ চিন্তার কাগজ আনতারা একটি চমৎকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে নিঃসন্দেহে৷ বাংলা সাহিত্যের অনিবার্য স্তম্ভ আল মাহমুদকে নিয়ে স্মরণ সভা করার মধ্য দিয়ে বস্তুত তারা নিজেদেরকে ইতিহাসের অংশ করে নিয়েছে৷ আল মাহমুদের তিরোধান পরবর্তী সময়ে কারা সর্ব প্রথম তাঁর কর্ম নিয়ে আলোচনা করেছে— এ প্রশ্ন যখন ভবিষ্যতে উচ্চারিত হবে তখন আনতারার নামই তো উঠে আসবে সর্বাগ্রে৷ তাই আমি আনতারা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাচ্ছি৷
কোরআন তেলাওয়াতের পর মনযূর আহমাদের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান শুরু হয়৷ মূলত এটি ছিল তার স্বরচিত প্রবন্ধ৷ আবেগঘন শব্দ তরঙ্গে সাজানো এ প্রবন্ধে তিনি আল মাহমুদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত হার্দিক সম্পর্ক ও আল মাহমুদের সৃষ্টির অনন্যতা তুলে ধরেন৷
মনযূর আহমাদের স্বাগত বক্তব্য শেষ হলে একে একে তুহিন খান, কবি হাসান রোবায়েত, আব্দুস সাত্তার আইনী, ইফতেখার জামিল, মিরাজ রহমান, আলী হাসান তৈয়ব, উবায়দুর রহমান খান নদবী, যাইনুল আবিদিন, কবি আল মুজাহিদী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন৷ বক্তারা তাদের আলোচনায় আল মাহমুদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন এবং তার সৃষ্টি নিয়ে তাত্ত্বিক ও যৌক্তিক আলোচনা তুলে ধরেন৷
অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই উপস্থিত তরুণদের আগ্রহের ব্যক্তি ছিলেন তুহিন খান ও কবি হাসান রোবায়েত৷ বরাবরের মতোই তুহিন খান তার চিন্তাশীল ও যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তরুণদের প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন৷ তুহিন খান তার বক্তব্যের মাধ্যমে পরিষ্কার করতে চেয়েছিলেন যে, আল মাহমুদ হঠাৎ করেই কোন এক সকালে ঘুম থেকে উঠে অবিশ্বাসীদের কাতার থেকে বিশ্বাসীদের কাতারে নাম লিখিয়েছেন—এমনটি নয়৷ বরং তিনি আশৈশব বিশ্বাসী ছিলেন৷ এবং আমি মনে করি তুহিন খান তার ক্ষুরধার আলোচনার মাধ্যমে খুব সুন্দর ভাবেই তার বক্তব্য প্রমাণিত করতে পেরেছেন৷
কবি হাসান রোবায়েতের উত্থাপিত প্রশ্ন আলোচনা সভা কে এক নতুন মাত্রা দান করে৷ উপস্থিত সকলের ভাবনাকে মুহূর্তেই তিনি যেন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন৷ তার আলোচনা এতটাই ক্যারিশম্যাটিক হয়েছিল যার ফলে পরবর্তী বক্তারা তার উত্থাপিত প্রশ্ন নিয়েই তাদের আলোচনা করতে বাধ্য হয়৷ কবি হাসান রোবায়েত আনতারার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলেন ভবিষ্যতে অন্য কোন কবিদের কে নিয়ে আনতারা এমন উদ্যোগ নিবে কিনা? তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে আমাদের এই এককেন্দ্রিক কার্যকলাপ দ্বারা আমরা আল মাহমুদকে ‘হুজুরিকরণ’ করে ফেলছি কিনা? ভবিষ্যতে এমন যেন না হয়, আল মাহমুদের অমর সৃষ্টি গুলো উপেক্ষিত হবে এই অজুহাতে যে তিনি তো ছিলেন হুজুরদের কবি!
আব্দুস সাত্তার আইনির কথাগুলো তাত্ত্বিক ছিল কোন সন্দেহ নেই৷ কিন্তু আমার কাছে মজা লেগেছে আরেক জায়গায়৷ তুহিন খান তার বক্তব্য যদি আব্দুস সাত্তার আইনির পরে দিতেন তাহলে যে কেউ বিশ্বাস করতে বাধ্য হতো, তুহিন খান যেন আব্দুস সাত্তার আইনির বক্তব্যের প্রতি উত্তর করছেন৷
শ্রদ্ধেয় উবায়দুর রহমান খান নদবী তার দীর্ঘ এক ঘন্টার আলাপচারিতায় অনেক তথ্য ও তত্ত্ব উপস্থিত করেছেন৷ তা সত্ত্বেও কোথায় যেন আমার মনে হয়েছে তার আলোচনা ঠিক আল মাহমুদ কেন্দ্রিক হয়নি৷ তার আলোচনার ফোকাস আল মাহমুদের দিকেই থাকবে এমনটা আশা করেছিলাম তার মঞ্চে ওঠার আগ পর্যন্ত৷
তবে আশাহত করেননি শ্রদ্ধেয় যাইনুল আবিদীন৷ তিনি তার বক্তব্যের পুরোভাগ জুড়েই আল মাহমুদকে নিয়ে ছিলেন৷ আল মাহমুদ কেন আমাদের কাছে এত প্রিয়, কেন তিনি আমাদের হৃদয়ে এত সহজে জায়গা করে নিতে পেরেছেন, সে বিষয়ে যাইনুল আবেদিন চমৎকার আলোচনা রেখেছেন৷ আর তার বক্তব্যের শক্তিমত্তা ও উপাস্থাপন নিয়ে আমি আর কি বলতে পারি৷ তিনি এক কথায় অনবদ্য, অনন্য৷
অনুষ্ঠানে আরো যার উপস্থাপন আমাকে মুগ্ধ করেছে তিনি হলেন আলী হাসান তৈয়ব৷ সবচেয়ে ভালো লেগেছে এটা দেখে যে, তিনি তার বক্তব্যের সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন৷ যখন বক্তব্য রাখছিলেন আমার কাছে মনে হচ্ছিল তিনি তার বক্তব্যকে নিজেও তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছেন৷ তার শব্দের উচ্চারণ, অঙ্গভঙ্গি আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে৷ উদ্বেলিত করেছে তার শব্দের প্রতিটি কম্পন৷
আমি আমার পাঁচ মিনিটের বক্তব্যে বলতে পেরেছিলাম আল মাহমুদ গোটা জীবন অবিশ্বাসীদের মাঝে থেকেও নিজের বিশ্বাস অবিচল রাখতে পেরেছিলেন৷ সাহিত্য করেছেন কিন্তু নিজের বিশ্বাস থেকে বিন্দুমাত্র স্খলিত হননি৷ অথচ আমরা যারা বর্তমান সময়ে সাহিত্য করছি তারা কেন জানি নিজেদের বোধের যায়গাটা ঠিক সেভাবে পোক্ত রাখতে পারছি না৷ কোথায় যেন আমাদের বিশ্বাসের মাঝে কিছুটা খামতি ঢুকে পড়ছে৷ নড়বড়ে হয়ে পড়ছে আমাদের চৈতন্যের স্তম্ভ৷ এবং আমি আহ্বান করেছিলাম—কবি আল মাহমুদের এ যায়গাটা আমাদের রপ্ত করতে হবে৷ আমাদের জানতে হবে কিভাবে তিনি অবিশ্বাসীদের মাঝে থেকেও বিশ্বাসের দ্যূতি ছড়িয়েছেন কোটি হৃদয়ে৷ তবেই আল মাহমুদ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবেন আমাদের যাপিত জীবনে৷
যে কোন আয়োজন সফল হওয়ার পিছনে সবচেয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেন যে ব্যক্তিটি তিনি হলেন সঞ্চালক৷ মানযূরুল হক তার সুনিপুণ দক্ষতা দিয়ে অনুষ্ঠানটি সফল করতে দারুন পারঙ্গমতা দেখিয়েছেন৷ তবে বক্তাদের জন্য জুতসই উপাধি খুঁজে না পেয়ে তার যন্ত্রণাদগ্ধ অবয়ব বেশ উপভোগ করেছি৷
আনতারার জন্য শুভকামনা রইলো৷ আনতারা বেঁচে থাকুক৷ দীর্ঘজীবী হোক৷ যেমন দীর্ঘজীবী হবেন সোনালি কাবিন, কালের কলসের আল মাহমুদ৷

সুন্দর লেখছেন তো! তবে গদ্যের ঢংটা কেমন সংবাদ-পঠনের মতো হয়ে গেল!
এটা কিছুটা প্রতিবেদনের মতো করেছিলাম