আমার মায়ের একটা আবেগীয় প্রত্যাশা হলো—আমাদের পরিবারের চারজন সদস্যই যেন জীবনভর একসাথে থাকি৷ কখওনই, মুহূর্তখানিকের জন্যেও তিনি আমাদের চারজনের মধ্যে ব্যবধান মেনে নিতে পারেন না৷ যে কারণে কোথাও বেড়াতে গেলে আমরা ঘরের চার সদস্য এক সঙ্গেই যাই৷ আমি একলা একা যা বেড়িয়েছি তা মাদরাসা থেকে৷ আমার মায়ের একদমই অগোচরে৷ সেসব ঘুরাঘুরির সংবাদ তার সম্পূর্ণই অজানা৷
আমার মায়ের তামান্না, ধারণা করি—এটা সব মায়েরই চাওয়া, আমি কেবল আমার মায়েরটা সুনিশ্চিত জানি বলে তার উল্লেখ করে বলছি৷ তো আমার মায়ের তামান্না—আমাদের দুই ভাইয়ের বিয়ের পরও যেন সবাই এক সাথে থাকি৷ এক পরিবারেই৷ ‘অন্য বাড়ির মেয়ে’ এসে যেন আমাদের পরিবারে ফাটল তৈরি করতে না পারে৷ সেজন্য ‘ভাই বড় ধন, রক্তের বাঁধন; যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ’ বাণী সম্বলিত ওয়ালম্যাট আমাদের দুই ভাইয়ের ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখেছেন তিনি৷ আমরা সেটা দেখে প্রত্যহ শপথ করি—জীবনভর এক সাথে থাকার৷
আমরা দুনিয়াতে এক থাকব সে চিন্তা তো আম্মু করেনই; মৃত্যুর পর জান্নাত জীবন নিয়েও তার ভাবনা৷ এই তো সেদিন খেতে খেতে প্রশ্ন তুললেন—জান্নাতে গিয়েও কি আমরা চারজন এভাবে একসাথে থাকতে পারবো! দুঃখ-সুখের আলাপনে মজতে পারব এমন একসাথে বসে!
মায়ের এমন সরল উদ্বেগ দেখে তাকে সান্ত্বনা দিই৷ বলি—আমাদের সবাইকে যদি আল্লাহ জান্নাত দান করেন তবে আশা করা যায় আমরা এভাবেই একসাথে থাকতে পারবো৷
আসলে এসব আবেগের পেছনে মূল ব্যাপারটা হলো ভালোবাসার৷ পরস্পরে যখন হৃদ্যতা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা গড়ে ওঠে তখন মন চায় পাশাপাশি থাকতে৷ কাছাকাছি অবস্থান করতে৷ আমার এক বন্ধু আছে৷ সে তো প্রায়ই বলে—জান্নাতে তুই-আমি এমন এক সাথে থাকতে পারব কি!
আমরা যারা মুমিন তারা তো মৃত্যু এবং তৎপরবর্তী জান্নাতী জীবনে বিশ্বাসী৷ যে কারণে এপার দুনিয়ার অন্তরঙ্গ মানুষটাকে এমন প্রবলভাবে ওপারেও কামনা করে উঠি৷
আমরা কেবল মা বাবা স্ত্রী পরিজন ও বন্ধু স্বজনকেই জান্নাতে পাশে পাবার আগ্রহ প্রকাশ করি তা নয়৷ বরং যেই আমাদের ভালোবাসার পাত্র, যাকেই আমরা অন্তর দিয়ে ভালোবাসি তাকেই জান্নাত-জীবনে সাথে পাবার আকাঙ্খা করি৷
নবিজির কথা বলি!
সন্দেহ নেই—মুমিন হৃদয়ে আর কেউ নেই তাঁর মতো ভালোবাসার আসনে আসীন৷ তাঁর মতো কে আছে আর শ্রদ্ধাভাজন! মুমিনের প্রিয়জন! মুমিন তাই জান্নাত-জীবনের পড়শি হিসাবে তাকেই কামনা করে ব্যাকুল হয়ে৷ জান্নাতে নবিজির সান্নিধ্য মিলবে—এমন জানতে পেরে জান্নাতের তাবৎ নেয়ামতও তো সামান্য হয়ে দেখা দেয় বহু মুমিনের চোখে৷
জনৈক মুমিনকে বলা হলো—এমন কাজ করলে তুমি জান্নাত পাবে৷
সে বলে—জান্নাতের কিছু নেয়ামতের বর্ণনা দাও তো!
তাকে বলা হলো—জান্নাতে তুমি নবিজিকে পাবে৷
এটা শুনতে পেয়ে সে আনন্দে আটখানা৷ নবির সান্নিধ্য মিলবে জান্নাতে! তবে আর কী লাগে৷ নবির পড়শি হবার জন্য আমি সব করতে রাজী৷
আমরা যারা মুমিন তারা তো মৃত্যু এবং তৎপরবর্তী জান্নাতী জীবনে বিশ্বাসী৷ যে কারণে এপার দুনিয়ার অন্তরঙ্গ মানুষটাকে এমন প্রবলভাবে ওপারেও কামনা করে উঠি৷
একটা মজার ব্যাপার কী, জানেন?
নবিজিকে আমরা যারা ভালোবাসি তারা প্রত্যেকেই জান্নাতে কিন্তু নবিজির সান্নিধ্য কামনা করি৷ সবাইই চাই—তিনি যেন আমার পড়শি হন৷ সকাল বিকাল নিয়ম করে যেন তাঁর সাথে আমার দেখা হয় জান্নাতের বাগিচায়৷ নবিজির প্রতি অফুরান ভালোবাসা থেকেই আমাদের এমন প্রত্যাশা৷
আবার দেখেন—জান্নাতে নবীজির সাথে থাকবার উপায়ও হলো তাঁকে প্রকৃতার্থে ভালোবাসা৷
এক আরব বেদুইনের গল্প বলি তবে৷
একবার নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর প্রিয়ভাজন খাদেম আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু মসজিদ থেকে বের হচ্ছেন৷ অকস্মাৎ এক বেদুইন নবিজির সামনে এসে পড়লো৷ সামনে আসতেই অন্য আলাপে যাবার পূর্বে প্রশ্ন করে বসলো সেই বেদুইন—‘হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামত সংঘটিত হবে কখন?
নবিজি তার এমন আচম্বিত প্রশ্ন শুনে তাকে বলেন—’তোমার ধ্বংস হোক৷ কিয়ামতের কথা জানতে যে চাইছো কিয়ামত দিবসের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো শুনি?’
নবিজির এমন জবাবে সে কিছুটা চুপসে গেলো৷ নরোম স্বরে বললো—’হে আল্লাহর রাসুল! কিয়ামতের জন্য অনেক বেশি সালাত আদায় করা, অনেক রোজা রাখা কিংবা অনেক বেশি পরিমাণে সাদাকা করা—এমন কোনো আমলই আমি করতে পারিনি৷ তবে আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবেসেছি৷ অনেক অনেক বেশি ভালোবেসেছি৷’
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন—’তবে আর চিন্তা কী! যাকে তুমি ভালোবাসো (জান্নাতে) তার সাথেই তুমি থাকবে৷ [1]বুখারি: ৭১৫৩, মুসলিম: ২৬৩৯
খুব মন চাইছে—আম্মুকে ডেকে জিজ্ঞেস করি—জান্নাতে নবিজির সাথে কি তুমি থাকতে চাও না! তাকে কতটুকু ভালোবেসেছো!
মন চাইছে জিজ্ঞাসা করি আমার সেই বন্ধুকে৷ আমার সাথে তো থাকতে চাইলি৷ জান্নাতে নবিজির পড়শি হওয়া নিয়ে তোর ভাবনা কী! প্রস্তুতিই বা কতটুকু!
খুব মন চাইছে নিজেকেই জিজ্ঞেস করি—কতটুকু ভালোবাসি তাঁকে! ফেসবুকে তাঁকে নিয়ে আবেগমাখা স্ট্যাটাস থেকে কতোটা ব্যাবধান তাঁর প্রতি আমার ভালোবাসার! সত্যিকারের ভালোবাসার!
প্রশ্ন আর করা হয় না৷ ইদানিং প্রশ্ন করতে আমার যতো ভয়!
দয়াময়!
আমাকে পিলাও তোমার প্রেমাস্পদের প্রেম-পেয়ালা৷ হাবিবের ভালোবাসায় হৃদয় আমার পূর্ণ করো৷ এ জীবন ধন্য করো; পুণ্য করো…
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | বুখারি: ৭১৫৩, মুসলিম: ২৬৩৯ |
|---|
