আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত করার জন্য। আবার ইবদাত কিভাবে করতে হবে সে পদ্ধতিও শিখিয়ে দিয়েছেন। আমরা যেন সর্বদা সত্য পথে থাকতে পারি সেজন্য নাযিল করেছেন কিতাব। নিঃসন্দেহে এ আমাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিরাট অনুগ্রহ।
কিন্তু, আমরাই আল্লাহ তায়ালার এমন কৃতঘ্ন বান্দা যারা তাঁর এই অনুগ্রহের কদর করতে পারি না। হাজারো বই পুস্তক পড়ে উঠলেও যে কিতাব তিনি আমাদের হেদায়েতের জন্য পাঠালেন সেই কুরআন কারিমই কেবল তেলাওয়াত করা হয় না। আমরা সর্বত্র উপদেশ ও নসীহাহ খুঁজে ফিরি অথচ আমরা ভুলে থাকি কুরআন কারীমেরই কথা। আমরা বিস্মৃত থাকি কুরআন কারীম সম্বন্ধেই। কুরআন থেকে নসীহত গ্রহণ করা হয় না। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলছেন,
বস্তুত আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। সুতরাং আছে কি কেউ, যে উপদেশ গ্রহণ করবে? [1]সুরা কামার, আয়াত ১৭
কুরআন কারীম তেলাওয়াত একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। যার প্রতি হরফে রয়েছে দশটি করে নেকি। কুরআন কারীমের তেলাওয়াত কখনও কখনও আমাদের দ্বারা হয়ে উঠলেও কুরআন নিয়ে ভাবনা চিন্তার কাজ একদমই হয় না। একটি আয়াত, আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতে কী বললেন, কেন বললেন সে বিষয়ে ভাবিত হবার কোনো প্রয়োজনই আমরা বোধ করি না। অথচ আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের নির্দেশ দিয়েছেন কুরআন নিয়ে চিন্তা করবার জন্য। আল্লাহ বলেছেন,
(হে রাসুল!) এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতের মধ্যে চিন্তা করে এবং যাতে বোধ সম্পন্ন ব্যক্তিগণ উপদেশ গ্রহণ করে। [2]সোয়াদ, আয়াত ২৯
এখন যে প্রশ্নটি আপনাদের মনে দেখা দিতে পারে–তাদাব্বুর বা কুরআন নিয়ে ভাবনা চিন্তার লাভটা কী? কুরআনের আয়াত নিয়ে ভাবলাম অনেকক্ষণ—এতে ফায়দাটা কী হবে?
কুরআন নিয়ে ভাবনার দ্বারা যে লাভ আমার হবে–
তাদাব্বুর ঈমান বৃদ্ধি করে।
যখনই কোনো সুরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের (অর্থ্যাৎ মুনাফিকদের) কেউ কেউ বলে, এ সুরাটি তোমাদের মধ্যে কার কার ঈমান বৃদ্ধি করেছে? যারা (সত্যিকারে) ঈমান এনেছে, এ সুরা বাস্তবিকই তাদের ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারা (এতে) আনন্দিত হয়। [3]তাওবা, আয়াত ১২৪
তাদাব্বুরে মাধ্যমে হৃদয়ে ভয়, শঙ্কা ও আশা সঞ্চারিত হয়।
আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী–এমন এক কিতাব যার বিষয়বস্তুসমূহ পরস্পর সুসামঞ্জস্য, (যার বক্তব্যসমূহ) পুনরাবৃত্তিকৃত, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এর দ্বারা তাদের শরীর রোমাঞ্চিত হয়। তারপর তাদের দেহ-মন বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে। এটা আল্লাহর হেদায়াত, যার মাধ্যমে তিনি যাকে চান সঠিক পথে নিয়ে আসেন। আর আল্লাহ যাকে বিপথগামী করেন, তাকে সঠিক পথে আনার কেউ নেই। [4]যুমার, আয়াত ২৩
নেক আমলের তাওফীক লাভ হয়।
এবং এটা এক বরকতময় কিতাব, যা আমি নাযিল করেছি, যা তার পূর্ববর্তী আসমানী হিদায়াতসমূহের সমর্থক, আর যাতে তুমি এর মাধ্যমে জনপদসমূহের কেন্দ্র (মক্কা) ও তার আশপাশের লোকদেরকে সতর্ক কর। যারা আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, তারা এর প্রতিও বিশ্বাস রাখে এবং তারা তাদের নামাযের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে। [5]আনআম, আয়াত ৯২
মোটকথা, তাদাব্বুর আপনাকে ঈমানের স্তর থেকে এহসানের স্তরে উন্নীত করবে। দুঃখ কষ্ট থেকে আনন্দ ও হার্দিক প্রশান্তির দিকে নিয়ে যাবে। তাদাব্বুর আপনার মনোবেদনা ও উদ্বেগ দূর করে আপনাকে এনে দেবে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্য। আপনাকে নিয়ে যাবে সংকীর্ণতা থেকে প্রশান্তির দিকে। দুর্বলতা থেকে শক্তিমত্ত্বার দিকে। প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে আনুগত্য ও নৈকট্যের সুস্বাদের দিকে। বিভ্রাট ও ভ্রান্তি থেকে সত্য ও হিদায়াতের দিকে। দুনিয়ার অপদস্থতা ও লাঞ্ছনা থেকে আখিরাতের সম্মান ও মর্যাদার দিকে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
তোমাদের মাঝে রেখে যাচ্ছি এমন কিতাব যা তোমরা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলে আমার পর কখনও বিভ্রান্ত হবে না। আর তা হলো কিতাবুল্লাহ তথা কুরআনুল কারীম। [6]মুসলিম
(আর কুরআন শক্তভাবে আঁকড়ে ধরার অর্থ হলো–তা বোঝা, তা নিয়ে তাদাব্বুর ও চিন্তা ভাবনা করা। এবং সে অনুযায়ী আমল করা।)
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
আর কুরআন তোমার পক্ষে সাক্ষী হবে কিংবা বিপক্ষে। [7]মুসলিম
পক্ষে সাক্ষী হবে যদি তা বুঝে, তা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করে সে অনুযায়ী আমল করা হয়। আর কুরআন বিপক্ষে সাক্ষী হবে, যদি আপনি তাকে উপেক্ষা করেন। তাকে এড়িয়ে চলেন। কুরআন শিখলেনও না সে অনুযায়ী আমলও করলেন না। তাহলে কুরআন আপনার বিপক্ষে কেয়ামত দিবসে বিবাদী হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে।
মোটকথা, কুরআন কারীম নিয়ে তাদাব্বুর এবং চিন্তা ভাবনার সব চাইতে বড় লাভ হলো–তাদাব্বুর হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে দেয়। ঈমানদারকে কুরআন অনুযায়ী আমল করতে উৎসাহিত করে। এমনকি এক সময় আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টিই তার তাদাব্বুরকারীর প্রধান আরাধ্য হয়ে ওঠে।
প্রিয়, কুরআন কারীমের তাদাব্বুর ও কুরআন কারীম নিয়ে ভাবনার প্রতি আপনাকে আহ্বান জানাই। আপনার নিকটস্থ আলেমের সাথে পরামর্শ করে আজই শুরু করুন কুরআন কারীমের পাঠ এবং তার ভাবনার মাঝে লীন হয়ে যাবার প্রয়াস। তবে আবারও সতর্ক করছি, অবশ্যই এ পথে রাহবার ও পথ প্রদর্শক হিসাবে কোনো বোদ্ধা আলেমকে আপনার পাশে রাখবেন। কুরআন কারীমের তাদাব্বুর যেমন জরুরী এ পথ তেমনই পিচ্ছিল। একটু অন্য মনস্কতাই আমাদের খাদের কিনারে ফেলে দিতে পারে। তাই অবশ্যই এ সফরে পোক্ত কোনো নির্দেশকের নির্দেশনা মেনে চলাই আমাদের জন্য নিরাপদ ও সুখকর হবে।
কুরআন কারীমের জন্য আল্লাহ আমাদের কবুল করুন।
