জানুয়ারী। ১
বছরের প্রথম কিম্বা শেষ দিন নিয়ে আমার আলাদা কোন পরিকল্পনা থাকে না; থাকে না রোজকার ব্যতিক্রম কোন আয়োজন৷ তবে এবার উনিশের শেষ দিনটি এবং বিশের সূচনা দিনটি বেশ ভিন্নভাবে কেটে গেল৷ বিশেষ করে উনিশের বিদায়ী দিনটি এতটাই ব্যতিক্রম ছিল যে, আমি আমার জীবনের এ পর্যন্ত কাটানো আনন্দঘন মুহূর্তগুলো থেকে নির্দ্বিধায় এই দিনটিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে উঠতে পারব৷
বিশের সূচনা অতোটা আনন্দদায়ী না হলেও সুখী ছিলাম; দিনভরই৷ সেটা উনিশের শেষ সূর্যাস্ত সুখকর হবার প্রভাবে হতে পারে৷ কিম্বা অন্য কোন কারণে৷ তা যে কারণেই হোক দিনটা মন্দ কাটেনি৷ স্পষ্ট করে বলতে হলে দিনটি আনন্দেই কেটেছে৷
সকালে ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি দারুল মাআরিফ থেকে বেরিয়ে পড়ি৷ আনাস আমাদের লেগুনা স্ট্যান্ড পর্যন্ত এগিয়ে দেয়৷ তারও যাওয়ার কথা ছিল আমাদের সাথে৷ গতরাতে ঘুমোতে যাবার আগেও আমরা, মানে আমি, জুবায়ের এবং আনাস ঐকমত্যে পৌঁছেছিলাম যে, আমরা আজ সকালে গোলাম মোস্তফার আহ্বানে চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে যাব৷ এই সুখ ভাবনা নিয়েই ঘুমোতে গেলাম৷ কিন্তু সকালে ঘুম ভেঙে আমরা যখন বেরোবার উদ্যোগ করছি আনাস জানালো সে যেতে পারছে না আমাদের সাথে৷ তার আজকের ক্লাসে উপস্থিতি খুবই জরুরী৷ এমন অজুহাতের মুখোমুখি হওয়া আমাদের স্বভাববিরুদ্ধ৷ তাই জোরাজুরি আর না করে আমি আর জুবায়ের বেরিয়ে পড়লাম৷ আমাদেরকে সকাল সাতটা চল্লিশের চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি অভিমুখী শাটল ট্রেন ধরতে হবে৷ কব্জি উটলে বিস্মিত চোখে আনাসকে আমরা বিদায় জানালাম৷ আর জামিয়া দারুল মাআরিফকে অনুচ্চস্বরে বলে এলাম—আল্লাহ চাইলে শীঘ্রই দেখা হচ্ছে আমাদের৷
জানুয়ারি। ২০
আমার বংশলতিকা যতদূর পাওয়া যায়—একজন আলেম নেই৷ বরং মাদরাসা পড়ুয়াদের অপছন্দ করে এমন মানুষের সংখ্যাই অধিক৷ আমার আব্বু নিজেও চাইতেন না—তার ছেলে মাদরাসাতে পড়ালেখা করবে৷ এরপরও আমি মাদরাসাতে পড়েছি৷ আমি কিভাবে মাদরাসাতে এলাম, বাড়িতে এ নিয়ে কী হাঙ্গামার মুখোমুখি হতে হয়েছে সেসব গল্প না হয় আরেকদিন করা যাবে৷ আজ একটা ভিন্ন গল্প বলি৷ পরিবর্তনের গল্প৷’
গল্পটি অনেকের কাছে খুবই সাদামাটা মনে হতে পারে; তবে আমার কাছে এই আটপৌরে গল্পটাই বেঁচে থাকার অবলম্বন৷
আমার আব্বু সাধারণ শিক্ষিত; আমার আম্মুও৷ তারা দীনের তেমন মৌলিক বিষয়গুলোও জানতেন না; বলতে দ্বিধা নেই—মানতেনও না৷ আমার মাদরাসা জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমি সবিস্ময়ে অবলোকন করছি—আমার আম্মু রোজ সকালে কোরআন খুলে বসেন৷ সন্ধ্যা হলে আব্বু মকতবগামী ছোট্ট শিশুটির মতো আরবী কায়দা খুলে ছলোছলো চোখে তাকিয়ে থাকেন৷ ছোট ভাই, আম্মু, আব্বু নামাজ পড়েন নিয়মমতো৷ নামাজ শেষে আম্মু আর আব্বুর কান্নামিশ্রিত মোনাজাত কোন দ্রষ্টার চক্ষুকেও বিগলিত করে৷
তাদের এ পরিবর্তনে আমার অবদান সামান্যই; একজন দরদী দায়ীর যে অবদান থাকতে পারে৷ মূলত এসব আল্লারই করুণা৷ আলহামদুলিল্লাহ৷
তো, আমি আমার পরিবার নিয়েই আছি৷ জাতির ‘হেদায়েতের ভার’ তুলে নেবো এতবড় কাঁধ আমার না৷ আপনারা জাতিকে নিয়ে ভাবেন৷ আমি ‘ক্বু আনফুসাকুম ওয়াহলীকুম’ নিয়ে থাকি৷ এখনও আমার ও আমার পরিবারের সংশোধনের অনেক কিছু বাকী৷
সেপ্টেম্বর। ২৯
শেষ দিনের সাক্ষর করে পরীক্ষার হল ছেড়ে বেরোলাম৷ এর মধ্য দিয়েই কি আমার দীর্ঘ মাদরাসা জীবনের অবসান হলো! নাম লিখিয়ে উঠলাম কি বঙ্গীয় আলেম সমাজের তালিকায়!
পরীক্ষার শেষ খাতা জমা দিচ্ছি যখন চোখের সামনে কোলাহল করে উঠলো যেন ফেলে আসা আটটি বছর৷ এই তো সেদিন, জেনারেল ধারার শিক্ষা কার্যক্রমে অকস্মাৎ ইস্তফা দিয়ে ভর্তি হলাম কওমি মাদরাসায়৷ আর মুহূর্তেই বদলে গেলো চেনাজানা কক্ষপথ৷ যে পথের ‘পরে চলমান হলো আমার জীবন তা ছিলো একদমই অচেনা; তবে পথ চলাতে ক্লান্তি আসেনি কখনও৷ দিনের পর দিন আমি হেঁটে চলেছি ফেরেশতাদের পর বিছানো ছায়াপথে৷
কি জানি সবারই এমন কিনা!
তবে প্রথম চারটি বছর আমাকে বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে বহু৷ আমার বংশলতিকার সন্ধান যতদূর জানা যায় তাতে মুমিন বান্দার উপস্থিতি আছে অনেক৷ তবে মাদরাসাতে পড়তে এসেছে স্মরণকালের আমিই কেবল৷ তেমন একটা পরিবারের বড় পুত্র এই আমি যখন জেনারেল শিক্ষা ধারার ‘ব্রাইট ফিউচার’ ফেলে ‘গরিবি’ এলেম কালাম শিখতে এলাম আঘাতটা আসতে থাকলো তাই অন্দর থেকেই বেশি৷
আমার পিতা, আল্লাহ তাকে রহম করুন, তিনবার আমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়েছেন যেন ফের আমি ‘সম্মানজনক’ পড়ালেখায় মনযোগী হই৷ আমার এক আত্মীয়ার কথা আজ মনে পড়ছে৷ মাদরাসাতে ভর্তি হয়েছি বলে তিনি যে ভাষায় আমাকে ব্যঙ্গ করেছিলেন তা এখনও বুকের মধ্যে বিদ্ধ কাঁটা হয়ে যন্ত্রণা দেয়৷
আমার মা আমাকে কখনও ছেঁড়ে যাননি৷ প্রথম তিন বছর পিতার চোখ এড়িয়ে তিনি তার জমানো টাকা থেকে খরচ পাঠাতেন আমার নামে৷
আল্লাহর শোকর, এক সময় পিতাকে আমি বোঝাতে সমর্থ হয়েছি৷ এবং বছর চারেকের মধ্যেই এই উপলব্ধ আমার আত্মীয় পরিজনের মধ্যে জাগাতে পেরেছি যে—দুই হাজার এগারো পূর্ববর্তী সাব্বির আর এগারো পরবর্তী সাব্বিরের মধ্যে যোজনের তফাৎ৷ মাদরাসার জীবনে আমার শিক্ষকমণ্ডলীর প্রভাব আমাকে এমন প্রভাবিত করেছে যার উষ্ণতা আমার মাদরাসা শিক্ষা-না পছন্দ স্বজনদেরও স্পর্শ করেছে৷ তাদের মুখে আজ, এই আট বছরের ব্যবধানে বহুবার উচ্চারিত হতে শুনেছি—একজন আলেমের জনক-জননী হবার সৌভাগ্য আমাদের কারুর নসীবে জুটলো না৷
আমার পিতাকে দেখি বন্ধু মহলে বুক টান করে মুখে উজ্জ্বল হাসি এঁকে বলেন—আমি একজন আলেমের পিতা৷ আমার মা জনে জনে গর্ব করেন—সন্তান আমার এলেম শিখেছে৷
এসব কি একজন মানুষের অর্জিত বিষয়াবলীর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে?
তাহলে বলবো—আট বছরে ইলম-আমল কতোটুকু হাসিল করলাম তার হিসাব অন্য সময়ের জন্য তোলা থাক৷ আমার পিতার মুখের হাসি, মায়ের গর্বিত উচ্ছ্বাস, স্বজনদের ভালোবাসামাখা চাহনি এই আট বছরে আমার অনন্য অর্জন৷
অক্টোবর। ৭
দুপুরের আহার সেরে মাত্র উঠেছি৷
আহসান ভাই প্রস্তাব করলেন—চলেন চাঁদপুর ঘুরে আসি৷ ঘুরতে ভালোবাসি৷ তারও অধিক ভালোবাসি নদীর বুকে ভাসমান শুভ্রোজ্জ্বল চাঁদের পাশে ভেসে বেড়াতে৷ নদীর জলে চাঁদের প্রতিফলিত আলো যখন চরাচরে ছড়িয়ে দেয় অমল ধবল জোৎস্না মুগ্ধতা নিয়ে জলের বুকে চেয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কোনো গতি থাকে না৷ এবং মন আমার বড্ড লোভাতুর এই রাশি রাশি ধবল জোৎস্নাধারার প্রতি৷ তাইতো আহসান ভাইয়ের অমন প্রস্তাবে সাড়া দিতে দ্বিতীয়বার আমাকে ভাবতে হয় না৷
বেরিয়ে পড়তে দ্বিধান্বিত যে হইনি আমি তার আরেক কারণ ছিল শ্রদ্ধেয় আবু জারির আবদুল ওয়াদুদ ভাইয়ের সান্নিধ্য প্রাপ্তির সুখ৷ অগ্রজ মানুষটির মুখোমুখি যখনই হয়েছি, কাটিয়েছি তার সান্নিধ্যে কিছুটা সময় তখনই নিজেকে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে অনুভব করেছি তার অভিজ্ঞানের পরশে৷
এই আজও, তার ক্ষণিকের সান্নিধ্যে শিখেছি ও জেনেছি এমন বহু অজানা যা জানতে আমার জীবনের আরও অনেকটা অংশ অতিক্রান্ত হয়ে যেতো৷ অগ্রজের সঙ্গ অনুজের এগিয়ে যাবার জন্যে যে কতোটা অপরিহার্য তার যেন সাক্ষাৎ প্রমাণ মিললো আজকের যাত্রার সামান্য সময়ের ব্যবধানে৷
আজকের এই আকস্মিক সফরের সব চাইতে স্মরণীয় হয়ে যা আরও সুদীর্ঘকাল রয়ে যাবে আমার করোটিতে—দু’টি মাদরাসা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা৷ যতদিন শিক্ষার্থী ছিলাম ততদিন যে কোনো মাদরাসার পরিদর্শনে যাইনি তা নয়৷ গিয়েছি৷ কিন্তু অনুভব করলাম— যেনবা আমি আজ মাদরাসা দুটিকে দেখলাম এক অপরিচিত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টিতে৷ এবং অতঃপর আমি প্রতিষ্ঠান দুটির ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রতিষ্ঠার কাল ও প্রেক্ষাপট যেনবা চিন্তা করলাম এক অচেনা মননে৷ মফস্বল কিংবা কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত মাদরাসা সম্বন্ধে আমি এভাবে কখনও ইতোপূর্বে ভাবনা তাড়িত হয়েছি বলে মনে করতে পারলাম না৷
মাদরাসা দুটি, বিশেষ করে শাহরাস্তির ছোট্ট প্রতিষ্ঠানটির দর্শন শেষে যে অভিজ্ঞতা ঝুলিতে পুরে ফিরতি লঞ্চে এসে উঠেছি তাতে মনে হলো সময়ে সময়ে নিয়মিত বিরতি দিয়ে মফস্বল ও দেশের প্রান্তবর্তী মাদরাসা গুলোর পরিদর্শন জরুরী৷ এবং আমি মাদরাসা পরিদর্শনের ধারাবাহিকতা শুরু করবার একটা মানসিক প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে ফেলেছি৷
দেশের কওমি মাদরাসাগুলো আমি ঘুরে দেখতে চাই৷ কেন চাই—তার বিস্তার আরেকদিন করা যাবে৷
তবে ভালো হতো—আমার সেসব সফরে সঙ্গী হিসাবে যদি আবু জারীর ভাইকে পাওয়া যেতো!

[381]ju7777 Official Login | সেরা অনলাইন স্লট ও বিকাশ ক্যাশআউট,ju7777 অফিসিয়াল সাইটে লগইন করে সেরা অনলাইন স্লট গেম উপভোগ করুন। সহজ অ্যাপ ডাউনলোড এবং দ্রুত বিকাশ ক্যাশআউটের সুবিধা পেতে আজই জয়েন করুন। visit: ju7777
[3205]FB777 Login: Register & Download FB777 Casino App for Slots Bonus,Access your FB777 login to experience the best online casino in the Philippines. Register today to download the FB777 casino app and claim your exclusive slots bonus and rewards. visit: fb777login