আল্লাহ তায়ালার পরে মুমিন হৃদয়ে অপার শ্রদ্ধা ও মুগ্ধকর ভালোবাসার আসনে যিনি আসীন তিনি আমাদের নবিজী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মুহাব্বাত ও ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়, দ্বীন ও ঈমানের বিষয়। একজন মুমিনের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সর্ব্বোচ্চ আসনে যিনি বরিত—তিনি আমাদের নবীজি৷ তাঁর প্রতি মুমিনের এই ভালোবাসা কেবল কর্তব্য, দায়িত্ব কিংবা মানবিক বিবেচনার বিষয় নয়; বরং দীনের অংশ৷ তাঁর প্রতি ব্যক্তির ভালোবাসার নিরিখেই পরিমাপিত হয় সেই ব্যক্তি কতোটা মুমিন আর কতোটা ভণ্ড!
কুরআন মাজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ কথা বলা হয়েছে। এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
বলুন, তোমাদের পিতা, তোমাদের পুত্র, তোমাদের ভাই, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের আত্মীয়-স্বজন এবং ওই সম্পদ, যা তোমরা উপার্জন কর এবং ব্যবসা-বাণিজ্য—যার ক্ষতির আশঙ্কা তোমরা কর এবং ঐ ঘর-বাড়ি, যাতে তোমরা বসবাস কর, যদি তোমাদের কাছে আল্লাহর চেয়ে, তাঁর রাসূলের চেয়ে এবং তাঁর রাস্তায় জিহাদের চেয়ে অধিক প্রিয় হয়ে থাকে তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। আল্লাহ সত্যত্যাগী সম্প্রদায়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন না। [1]সূরা তাওবা : ২৪
হাদীস শরীফে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জবানিতেও এ সতর্ক বাণী উচ্চারিত হয়েছে৷ নবীজি বলেছেন,
তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা থেকে, পুত্র থেকে এবং সকল মানুষ থেকে অধিক প্রিয় না হই। [2]হযরত আনাস রা.-এর সূত্রে, বুখারী, কিতাবুল ঈমান, হাদীস : ১৫; মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, … Continue reading
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশের নানা উপায় ও পন্থা বর্ণিত হয়েছে কুরআন কারীম ও সুন্নাহতে৷ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশের যে সকল পদ্ধতি শরীয়ত আমাদের বাতলে দিয়েছে তার একটি হলো দুরূদ শরীফ পাঠ করা৷ আল্লাহ তায়ালা কুরআন কারীমে বলছেন—
আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি রহমত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরা নবীর জন্যে রহমতের তরে দোয়া করো এবং তাঁর প্রতি সালাম প্রেরণ করো। [3]সূরা আহযাব, আয়াত: ৫৬
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেন—
যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করবে আল্লাহ তায়ালা তার উপর দশবার রহমত নাযিল করবেন। [4]নাসায়ী
একজন মুমিন তার সব চাইতে বড় পুঁজি হলো আল্লাহ তায়ালার রহমাত৷ আল্লাহ তায়ালার রহমাত বর্ষিত হয় যার ওপর অপার বৃষ্টি ধারার মতোন তার আর ভাবনা কিসে! সে তো পৃথিবীর বুকে সৌভাগ্যবান একজন মানুষ৷ মুমিন মাত্রেই তাই কামনা করে আল্লাহ তায়ালার রহমাত৷ নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই রহমাত লাভের কত সহজ একটি উপায় বলে দিচ্ছেন—দুরূদ পাঠ৷ নবিজীর উপর একবার দুরূদ পাঠ করবেন তো দশবার রহমাত নেমে আসবে আপনার ‘পরে৷ এমন নেয়মাত কি তুচ্ছ করা চলে!
আমাদের তো এখন কর্তব্য—উঠতে বসতে হারহামেশা রসনাকে সিক্ত রাখা নবজীর ওপর দুরূদ পাঠে৷ কত সময় আমরা বেকার বসে থাকি! জীবনের কত মুহূর্ত কেটে যায় আমার অনর্থক আলাপনে! অথচ আমি চাইলে পারতাম দুরূদ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার রহমাতকে নিজের করে নিতে৷
আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাওফিক দান করুন দুরূদ পাঠের মাধ্যমে জিহ্বাকে সিক্ত রাখবার৷
নবিজীকে ভালোবাসার কত আওয়াজ তো আজকাল আমরা মুখে উচ্চারিত করি৷ কতোটা ভালোবাসি তা আল্লাহ তায়ালার কাছে নিশ্চয়ই গোপন নয়৷
নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর দুরূদ পাঠ করবার একটি বিশেষ সময় হলো শেষরাত৷ যখন বিশ্ব চরাচর নিস্তব্ধ৷ রাতের অন্ধকারের মতোই পৃথিবী তলিয়ে আছে ঘুমের অতলে তখন আপনি জেগে উঠুন৷ হৃদয়কে আপ্লুত করে তুলুন দুরূদ শরীফের একেকটি হরফের উচ্চারণে৷ দেখবেন—অনাবিল প্রশান্তি নেমে আসবে আপনার জীবনের অলিন্দে৷
শেষরাতে দুরূদ পাঠ সম্পর্কে নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবিকে কী বলছেন চলুন শুনে আসি৷ আমাদেরকে জানাচ্ছেন হজরত উবাই ইবনু কা’ব রাদিয়াল্লাহু আনহু৷ তিনি বলেন,
রাতের দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘুম থেকে জেগে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে মানবগণ! তোমরা আল্লাহ্ তা’আলাকে স্মরণ কর, তোমরা আল্লাহ্ তা’আলাকে স্মরণ কর। কম্পন সৃষ্টিকারী প্রথম শিঙ্গাধ্বনি এসে পড়েছে এবং এর পরপর আসবে পরবর্তী শিঙ্গাধ্বনি। মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, মৃত্যু তার ভয়াবহতা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।
উবাই রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি তো খুব অধিক হারে আপনার প্রতি দরুদ পাঠ করি। আপনার প্রতি দরুদ পাঠের জন্য আমি আমার সময়ের কতটুকু খরচ করবো? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়ে অধিক পরিমাণে পাঠ করতে পারলে এতে তোমারই মঙ্গল হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি কি অর্ধেক সময় দরুদ পাঠ করবো? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ চাও, যদি এর চেয়েও বাড়াতে পারো সেটা তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় দরুদ পাঠ করবো? তিনি বললেন, তুমি যতক্ষণ ইচ্ছা করো, তবে এর চেয়েও বাড়াতে পারলে তোমারই ভাল। আমি বললাম, তাহলে আমার পুরো সময়টাই আপনার দরুদ পাঠে কাটিয়ে দিব? তিনি বললেন—তোমার চিন্তা ও কষ্টের জন্য তা যথেষ্ট হবে এবং তোমার পাপসমূহ ক্ষমা করা হবে। [5]তিরমিযী
নবিজীকে ভালোবাসার কত আওয়াজ তো আজকাল আমরা মুখে উচ্চারিত করি৷ কতোটা ভালোবাসি তা আল্লাহ তায়ালার কাছে নিশ্চয়ই গোপন নয়৷
দুরূদ পাঠের মাধ্যমে নবিজীর প্রতি ভালোবাসার নাজরানা পেশ করার জন্য আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে কবুল করুন৷
