সৌন্দর্য এবং বেদনা সাহিত্য সৃষ্টিতে প্রধান প্ররোচক— এমনটা বোদ্ধা ব্যক্তিরা বলে থাকেন৷ সৌন্দর্যে কাশ্মীর পৃথিবীর জান্নাত৷ আর যুগ যুগ ধরে প্রতারিত হতে থাকা রক্তলাল কাশ্মীরের মতো বেদনাহত ভূখণ্ড এই দুনিয়াতে আর দ্বিতীয় কোনটি আছে! সে কারনে বুঝি অনেকেই বলতে দ্বিধা করেন না— কাশ্মীর সাহিত্যের জন্য এক উর্বর(!) জমিন৷
কাশ্মীরি সাহিত্যের কথা বলতে গেলে যে মানুষটির কথা আবিশ্যিকভাবে চলে আসে তিনি একজন নারী৷ বলা হয়— কাশ্মীরি সাহিত্যের ভিত্তিই রচিত হয়েছিল এই নারীর হাতে৷ লালা, লালা দেদ কিংবা লালেশ্বরী নামের চতুর্দশ শতকের এই কবি যুগপৎভাবে কবিতা ও দর্শন নিয়ে কাজ করেছেন৷ লালা দেদ তখনকার কাশ্মীরে বাসকারী হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে ওঠেন৷ হিন্দুরা তাকে ডাকতেন লাল্লা যোগেশ্বরী আর মুসলিমদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন লাল্লা আরিফা হিসাবে৷ লালা দেদ আধ্যাত্মবাদী কবিতা রচনার নতুন এক শৈলী নির্মান করেছিলেন৷ লালা দেদের মৃত্যু হয় ১৩৭৩ সালে৷ এই এত বছর পর লালাদেদ এখনও কাশ্মীরে জনপ্রিয়৷ তিনি শুধু ধর্মীয় সাহিত্যকেই প্রভাবিত করেছিলেন এমন নয়, সকল কবিতাপ্রেমী মানুষের ঠোঁটে তিনি তার কবিতার স্তবক তুলে দিতে সমর্থ হয়েছিলেন৷ তার কবিতা এখনও কাশ্মীরে বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে গীত হয়৷ এমনকি বর্তমানে অনেক তরুণ লেখকও লালা দেদের মধ্যে তাদের সাহিত্য-চর্চার প্রেরণা খুঁজে পান৷
লালা দেদের পর কাশ্মীরের প্রধান কবি হিসাবে যিনি সমাদৃত হন তিনিও একজন নারী৷ হাব্বা খাতুন৷ গীতিকবিতা রচনা এবং তা সুর করে গাওয়ার অপরাধে(!) হাব্বা খাতুনের স্বামী তাকে ত্যাগ করেন৷ তবে তার সৌন্দর্য ও প্রতিভা আকৃষ্ট করে ফেলে রাজকুমার ইউসুফ শাহ চাককে৷ ইউসুফ শাহ চাক হাব্বা খাতুনকে বিয়ে করে রাজকুমারীর মর্যাদা প্রদান করেন৷
কিন্তু হাব্বা খাতুনের এই সুখ স্থা়ৃয়ী হয় না৷ দিল্লীর তৎকালীন সম্রাট আকবর কাশ্মীরের আনুগত্য অর্জন করতে চাইলে রাজকুমার ইউসুফ শাহ চাক বাঁধা হয়ে দাঁড়ান৷ পরে সভাসদদের পরামর্শে সম্রাট আকবর ইউসুফ শাহ চাককে দিল্লিতে আমন্ত্রণ করে নেন এবং কৌশল করে হত্যা করে ফেলেন৷ ইউসুফ শাহ চাক আর ফিরে আসতে পারেন না রাজধানী শ্রীনগরে৷ স্বামীর মৃত্যুশোটকে হাব্বা খাতুন পাগলের মতো হয়ে পড়েন৷ রাজ প্রাসাদ ছেড়ে আশ্রয় নেন ঝিলাম নদীর তীরে ছোট্ট একটি কুটিরে৷ আমৃত্যু বিরহ-বেদনার গীতিকাব্য রচনা করে ১৬০৯ সালে তিনি মৃত্যু বরণ করেন৷ জম্মু-শ্রীনগর মহা সড়কের পাশে তার সমাধি সাহিত্য প্রেমিকদের অন্যতম তীর্থ৷
সম্প্রতি কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের মঞ্চগুলো নানান সময়ে প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে তার কবিতা বেছে নিয়েছে৷ দ্বীপ্ত ভঙ্গিমায় তার কবিতা আন্দোলনকারী তরুণদের কণ্ঠে আবৃত্ত হয়৷
কাশ্মীরি সাহিত্যে আধুনিক কবিতার সূচনা পীরজাদা গুলাম আহমেদের (১৮৮৭-১৯৫২) হাত ধরে৷ কাব্য চর্চায় তিনি মাহজুর নামে খ্যাত৷ কবি মাহজুরের জন্ম পুলওয়ামায়৷ পাঞ্জাবে ঘুরতে গিয়ে উর্দু ভাষার অন্যতম কবি শিবলী নোমানীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাব্য চর্চা শুরু করেন তিনি৷ মাহজুরের কবিতার মূল প্রতিপাদ্য কাশ্মীরি জাতীয়তাবাদ৷
বিশ শতকের আধুনিক কাশ্মীরি কবিতার অন্যতম কবি হলেন দীননাথ নাদিম (১৯১৬-১৯৮৮) নাদিম ই সর্ব প্রথম কাশ্মীরি কাব্যে ‘ফ্রি ভার্স’ শৈলী চালু করেন৷ কাশ্মীরি সাহিত্যের আরও একটি ধারায় নাদিমের অবদান রয়েছে৷ তা হলো ছোটোগল্প৷ কাশ্মীরি কাব্যধারা প্রাচীন হলেও কাশ্মীরি সাহিত্যে ছোটোগল্পের কোন অস্তিত্ব ছিল না৷ অন্তত গত শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত৷ নাদিমের লেখা ‘জাওয়াবি কার্ড’ কাশ্মিরী সাহিত্যের প্রথম ছোটোগল্প৷ অবশ্য কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেন৷ তাদের মতে কাশ্মীরি সাহিত্যে প্রথম ছোটোগল্প সোমনাথ জুৎসির ‘ইয়ালি ফুল ঘাস৷’ সোমনাথ জুৎসি ১৯৫০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি শ্রীনগরে এক সাহিত্যসভায় তার গল্পটি পাঠ করে শুনিয়েছিলেন৷
সাহিত্যকে যদি প্রতিবাদের হাতিয়াররূপে গন্য করা হয় তাহলে বলতেই হয়, কাশ্মীরিরা সে হাতিয়ার চালনা এখনও যথার্থরূপে রপ্ত করে উঠতে পারেনি৷ যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে৷ অন্তত ফিলিস্তিনিদের তুলনায়৷
তবে কাশ্মীরে ঘটে যাওয়া অবিশ্বাস্য সব যাতনার বিরুদ্ধে বারবার গর্জে উঠেছে যার কবিতা তিনি আগা শহীদ আলী (১৯৪৯-২০০১)৷ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বা ইংরেজি ভাষায় গত শতকে কাশ্মীরি সাহিত্যের প্রধান চরিত্রও তিনি৷
শৈশব থেকে কবিতার প্রতি তার ভালোবাসা৷ প্রথম কবিতা বাবাকে দেখিয়ে পুরস্কার জিতে নেন কবিতার নোট খাতা৷ সেটিই কবিতা লেখার ক্ষেত্রে প্রেরণার বাতিঘর হয়ে থিতু হয় শাহেদ আলীর মনে৷ তার সঙ্গে ছিল কাশ্মীরি জনতার প্রতি ভারতের অত্যাচারের নির্মম সব অভিজ্ঞতা৷ ওই অভিজ্ঞতার সঙ্গে দেশান্তরি হৃদয়ের লম্বা যাত্রাপথ তার কবিতায় ফুটে ওঠে৷ ১৯৭০ সাল থেকেই তার কবিতা নানান যায়গায় প্রকাশিত হলেও ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত তার কবিতার বই ‘অ্যা ওয়াক থ্রো দি ইয়েলো পেসেজ’ সবার নজর কেড়ে নেয়৷ এরপর একটু বিরতি নিয়ে তিনি প্রাকাশ করেন ‘অ্যা নস্টালজিস্ট’স ম্যাপ অফ অামেরিকা৷’ ১৯৯১ সালে এটি প্রকাশিত হয়৷ এই কাব্যগ্রন্থে তার প্রবাস জীবন ও কাশ্মীরের প্রতি স্মৃতিকাতরতা ফুটে উঠেছে গভীরভাবে৷
তবে আগা শহীদ আলীর সবচে’ বিখ্যাত কাজ ‘দ্য কান্ট্রি উইদাউট আ পোস্ট অফিস৷’ বইটি প্রথমে ‘কাশ্মীর উইদাউট আ পোস্ট অফিস’ শিরোনামে প্রাকাশিত হয়েছিল৷ পরবর্তী সময়ে কবি তার বইটি পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করেন৷ ১৯৯৭ সালে সেই পরিবর্ধিত সংস্করণটি ‘দ্য কান্ট্রি উইদাউট আ পোস্ট অফিস’ শিরোনামে বের হয়৷ প্রকাশের পর পরই সর্বস্তরের পাঠকের মনোযোগের কেন্দ্রে হাজির হন তিনি৷
১৯৯০ সালে কাশ্মীরের সংক্ষুব্ধ জনতা ভারতের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে প্রবল সামরিক অভিযানের মুখোমুখি হতে হয় তাদের৷ পাগলাটে সামরিক বাহিনী আরও প্রবল বিক্রমে উৎপীড়ন চালাতে শুরু কাশ্মীরিদের ওপর৷ গুলি, ধোঁয়া, মৃত্যু, বৃষ্টি আর আগুনে ডুবে গিয়েছিল আগ শহীদের মাতৃভূমি কাশ্মীর৷ মাসের পর মাস পোস্ট অফিসগুলো বন্ধ৷ আর তাতে জমছিল বিলি না করা চিঠির পাহাড়৷ আগা শহীদ আলীর বাবার এক বন্ধুর বাসার কাছেই ছিল একটা পোস্ট অফিস৷ নিজের বাসা থেকেই তাকিয়ে দেখতেন সেখানে জমে থাকা চিঠির স্তুপ৷ তারপর একদিন পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে স্তুপের উপরের দিকের একটি চিঠি তুলে নিলেন৷ অবাক হয়ে দেখেন— চিঠিটি তাকেই পাঠানো তার বাবার চিঠি৷
সম্প্রতি কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলনের মঞ্চগুলো নানান সময়ে প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে তার কবিতা বেছে নিয়েছে৷ দ্বীপ্ত ভঙ্গিমায় তার কবিতা আন্দোলনকারী তরুণদের কণ্ঠে আবৃত্ত হয়৷ স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গি এবং ইউরোপিয়ানসহ ফার্সি, আরবি ও উর্দু কবিতার নানান উপাদান তার কবিতায় হাজির থাকে৷ ফলে তার কবিতা হিন্দু, মুসলিম ও পাশ্চাত্য তিনটি সংস্কৃতি ধারণ করে ভিন্ন রকম এক দ্যোতনা সৃষ্টি করে এগিয়ে যায়৷
কাব্যে কাশ্মীরি সাহিত্য নিজস্ব ভাষা তৈরি করে নিতে সমর্থ হলেও উপন্যাসে যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে৷ সমালোচকদের মতে পুরো কাশ্মীরি সাহিত্য ঘাটলে এক ডজন সার্থক উপন্যাস খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে৷ ইংরেজি ভাষায় রচিত কাশ্মীরি যে উপন্যাসগুলো সাহিত্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে তার মধ্যে আছে মির্জা ওয়াহিদের ‘দ্য কোলাবোরেটর’ এবং ‘দ্য বুক অব দ্য গোল্ড লিভস৷’ কাশ্মীরে বড় হয়ে লন্ডনে থিতু হওয়া মির্জা ওয়াহিদের দুটি উপন্যাসই ইংরেজি সাহিত্য সমালোচকদের প্রসংসা কুড়িয়েছে৷ শাহনাজ বশিরের ‘দ্য হাফ মাদার’ এবং ‘দ্য স্কাটারড সউলস’; সিদ্ধার্থ গিগুর ‘দ্য গার্ডেন অব সলিচিউড’ ‘মেহের’; নিতাশা কউলের ‘রেসিডিউ’ উপন্যাসগুলোও সাহিত্যপ্রেমিদের নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে৷ নাতাশ কউলও কাশ্মীরে বেড়ে উঠে লন্ডনে বসবাস করা লেখক৷ কাশ্মীরি সাহিত্যে আরেকটি আলোচিত উপন্যাস চমন লাল হুখু রচিত ‘লায়ন অব বাস্তুরবন৷’ প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে৷ উপন্যাসটি কিছুটা রূপকাশ্রিত৷ ‘বাস্তুরবন’ এখানে সমগ্র কাশ্মীরের ভূমিকায়৷ সাহিত্য সমালোচকরা মনে করেন, উপন্যাসটিতে লেখক কাশ্মীরি সাহিত্যের পুরনো শৈলীর সাথে আধুনিক সাহিত্যরীতি যুক্ত করেছেন৷ যার ফলে উপন্যাসটি ভিন্ন এক মাত্রা পেয়েছে৷
সাহিত্যকে যদি প্রতিবাদের হাতিয়াররূপে গন্য করা হয় তাহলে বলতেই হয়, কাশ্মীরিরা সে হাতিয়ার চালনা এখনও যথার্থরূপে রপ্ত করে উঠতে পারেনি৷ যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে৷ অন্তত ফিলিস্তিনিদের তুলনায়৷ নিজেদের অধিকারের কথা, নিপীড়িতদের বেদনাহত জীবনের কথা নানান প্রক্ষিতে নানান আঙ্গিকে দুনিয়ার মানুষের সামনে হাজির করতে ভাষা-সাহিত্যকে আন্দোলনের হাতিয়াররূপে অবলম্বন ছাড়া ভিন্ন কোন পথ নেই৷ কাশ্মীরিদের তাই এদিকটাতে মনোযোগী হতে হবে৷
তবে আশার কথা হলো— সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে এই বোধ বেগবান হচ্ছে৷ তারা নিজেদের নিগৃহীত জীবনের গল্প পৃথিবীর ইথারে ছড়িয়ে দিতে কলমের আশ্রয় নিচ্ছেন৷ কবিতা, গল্প, উপন্যাস— সাহিত্যের প্রধান মাধ্যমগুলোতে তারা নিজেদের আওয়াজ উচ্চকিত করছেন৷ দ্রোহের আগুন প্রজ্জলিত করে আগামির জন্য আশা জাগিয়ে তুলছেন৷ এইসব স্বাপ্নিক তরুণদের মধ্যে আদনান শাফি, ইনশা আশরাফ খাজা, মীর সাকিব ফারুক এবং রাফিয়া মুখতার অন্যতম৷ দিন দিন এ মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে৷ এভাবে চলতে থাকলে শীঘ্রই কাশ্মীরি সাহিত্য একটি ভিন্নধর্মী আন্দোলনে পরিণত হবে৷ যা কাশ্মীরের স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করতে গতি সঞ্চার করবে বলে আমাদের বিশ্বাস৷
শেষ করবো এই সময়ের কাশ্মীরি সাহিত্যের অন্যতম কবি আদনান শাফির একটি কবিতা দিয়ে৷ অনুবাদ করেছেন শানজিদ অর্ণব৷
‘স্তব্ধতা আবার ভেঙে গেছে
শহরের মানুশ বিলাপ করছে
বহুদিন ধরেই তাদের চোখ দেখছে
একের পর এক শোকযাত্রা৷
মৃত্যু এখানে আসে রাতের বেলা৷
শরৎকাল গোলাপ আর ফুলের বাগানগুলো
নিষ্প্রাণ করে দিয়েছে৷’
